গত ১৮ মে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো শহরের ‘ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো’ এক ভয়াবহ রক্তপাতের সাক্ষী হতে পারত। দুই কিশোর বন্দুকধারী যখন অতর্কিত হামলার মাধ্যমে এই ধর্মীয় উপাসনালয়ে তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা করছিল, তখন তাঁদের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক অকুতোভয় মানুষ। নিজের জীবন বিপন্ন করে কয়েক ডজন শিশুসহ অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে তিনি আজ বিশ্বজুড়ে এক ‘বীর’ হিসেবে স্বীকৃত। এই মহানায়কের নাম আমিন আবদুল্লাহ, যিনি ওই মসজিদেরই নিবেদিতপ্রাণ নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন।
হামলার সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে হামলাকারীদের বুলেটের আঘাতে আমিনসহ মোট তিনজন প্রাণ হারান। পরবর্তীতে পুলিশি ঘেরাওয়ের মুখে দুই আক্রমণকারী কিশোরও আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সান ডিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আমিনের সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে তাঁর কাজ ছিল বীরত্বপূর্ণ। আজ তাঁর অসামান্য প্রতিরোধের কারণেই অনেকগুলো অমূল্য প্রাণ বেঁচে গেছে।’
আমিনের এই আত্মত্যাগ তাঁর প্রাক্তন সহকর্মী কাশিফ উল হুদার কাছে মোটেই বিস্ময়কর মনে হয়নি। আল-জাজিরায় লেখা এক আবেগঘন নিবন্ধে কাশিফ তাঁর প্রিয় বন্ধু ও সহকর্মীর স্মৃতিচারণা করেছেন। কাশিফ জানান, আমিনের মধ্যে অন্যকে আগলে রাখার এক সহজাত প্রবৃত্তি ছিল। ১৯৯৫ সালে ভারত থেকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়া কাশিফ গত ডিসেম্বরে তাঁর বাবার জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর আমিনের সাথে পুনরায় দেখা করেছিলেন।
কাশিফের বর্ণনায়, সান ডিয়েগোর এই মসজিদটি আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন, যার মিনার ও গম্বুজ দূর হাইওয়ে থেকেও দৃশ্যমান। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের উত্থান এবং সমান্তরালে বৃদ্ধি পাওয়া ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষের সাক্ষী এই ইসলামিক সেন্টার। গত কয়েক বছর ধরে মসজিদের প্রবেশপথে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানেই দায়িত্ব পালন করছিলেন আমিন। কাশিফ যখন তাঁকে দেখলেন, তখন আমিন তাঁর চিরচেনা সেই প্রশস্ত হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
পেশাগত জীবনে আমিনের যাত্রা ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। একসময় তিনি একটি ‘ডেন্টাল অফিসে’ কাজ করতেন। যদিও কারিগরি কাজে তিনি খুব একটা পারদর্শী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর অমায়িক ব্যবহার আর হাসিমুখ তাঁকে সবার প্রিয় করে তুলেছিল। ইউনিফর্ম বা উর্দি পরা বাহিনীর প্রতি আমিনের ছিল প্রবল মুগ্ধতা। পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনলেই তিনি রোমাঞ্চিত হতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর সেই পছন্দের ‘সিকিউরিটি অফিসার’ বা নিরাপত্তা কর্মকর্তার পোশাক গায়েই বীরত্বের সাথে বিদায় নিলেন।
একজন আফ্রিকান আমেরিকান মায়ের সন্তান আমিন আবদুল্লাহ ছিলেন একজন খাঁটি আমেরিকান এবং একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। আরবী শব্দ ‘আমিন’-এর অর্থ হলো ‘বিশ্বস্ত’। নিজের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি তাঁর নামের সার্থকতা প্রমাণ করে গেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দুই বিপথগামী মার্কিন তরুণের বুলেট তাঁর শরীর ঝাঁঝরা করে দিলেও, তাঁর বীরত্ব সান ডিয়েগোর মুসলিম কমিউনিটিসহ বিশ্ববাসীর কাছে এক অমর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।