শৃঙ্খলাই বাহিনীর মূল শক্তি; আনসার ও ভিডিপি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈপ্লবিক রোডম্যাপ

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বাহিনীর ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে এক অত্যন্ত আধুনিক ও সময়োপযোগী দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান সরকার আনসার-ভিডিপি সদস্যদের কেবল লাঠি বা রাইফেল হাতে পাহারায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, নিবিড় দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই বিশাল বাহিনীকে একটি ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্মে’ পরিণত করা হচ্ছে। এর ফলে বাহিনীর প্রতিটি সদস্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের জন্য নিজেকে দক্ষ সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন।

গাজীপুরের সফিপুরে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাহিনীর সদস্যদের জন্য গৃহীত বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘এভিজবস’ (AVJobs) নামক বিশেষায়িত জব পোর্টাল এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আনসার সদস্যদের জন্য দেশি-বিদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে রিক্রুটিং এজেন্সির ‘লাইসেন্স’ গ্রহণ করেছে আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। এর মাধ্যমে বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদেশের মাটিতে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। সদস্যদের আত্মনির্ভরশীল করতে ‘সঞ্জীবন প্রকল্পের’ আওতায় গ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি এবং জামানতবিহীন ঋণের সুবিধাও দিচ্ছে সরকার।

প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। তাই বাহিনীর সদস্যদের জন্য জাপানি ভাষা শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং অত্যন্ত কারিগরি মানের ‘সিক্স-জি ওয়েল্ডিং’-এর মতো যুগান্তকারী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের সংমিশ্রণে আনসার ও ভিডিপি অদূর ভবিষ্যতে একটি ‘প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক সামাজিক বাহিনী’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হবে।

তবে যেকোনো বাহিনীর পেশাদারিত্বের মূলে যে শৃঙ্খলা বা ‘ডিসিপ্লিন’ নিহিত, সে বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন সরকার প্রধান। তিনি বলেন, “যেকোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য ‘চেইন অব কমান্ড’ মেনে চলা এক অপরিহার্য নীতি। শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সামান্যতম অবহেলাও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই প্রতিটি সদস্যকে বাহিনীর গৌরবময় ঐতিহ্য ও নিয়মাবলীর প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।” মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর ভূমিকার কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে তিনি জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধে ৪১ হাজার রাইফেল হাতে অংশ নিয়েছিলেন আনসার সদস্যরা এবং তাঁদের মধ্যে ৬৭০ জন বীর সদস্য আত্মত্যাগ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী পদক্ষেপের কথা স্মরণ করেন, যিনি স্বাধীনতার পর আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে একীভূত করে আজকের এই শক্তিশালী কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পাশাপাশি ১৯৯৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় এই বাহিনীকে একটি স্বতন্ত্র ‘ডিসিপ্লিনড ফোর্স’ বা শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আনসার সদস্যদের ‘ফ্রন্টলাইন’ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।

বর্তমানে ৪৭টি ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা পর্যন্ত যে বিশাল নিরাপত্তা বলয় আনসার বাহিনী তৈরি করেছে, তাকে আরও শক্তিশালী করতে বেশ কিছু নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। ‘আনসার ব্যাটালিয়ন বিধিমালা ২০২৬’ এবং ‘অঙ্গীভূত আনসার বিধিমালা ২০২৬’ সহ একগুচ্ছ নতুন প্রবিধানমালা অচিরেই কার্যকর হবে। ক্রীড়া ক্ষেত্রেও বাহিনীর সদস্যদের অসামান্য অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার খেলোয়াড়দের জন্য ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও বিশেষ বেতন কাঠামো চালু করেছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সদর দপ্তরে ‘বায়োমেট্রিক’ উপস্থিতি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে তিনি এক আধুনিক জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার মডেল হিসেবে অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সামগ্রিক দিকনির্দেশনা আনসার ও ভিডিপিকে আগামীর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে এক অপরিহার্য শক্তিতে রূপান্তর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।