ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাণকেন্দ্র নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আজ রোববার এক আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘২য় জুলাই বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিজেআর-II ২০২৬)’। এই সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ নিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ ও তথ্যসমৃদ্ধ এক বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, পতিত স্বৈরাচারী শক্তির দোসররা লুণ্ঠিত অর্থ ব্যবহার করে দেশের অর্জিত স্বাধীনতা ও বিপ্লবকে বিশ্বমঞ্চে কলঙ্কিত করার এক হীন চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
সম্মেলনের মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাদিক কায়েম বলেন, “স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অনেক নেতা বাংলাদেশ থেকে চুরি করা কোটি কোটি ডলার নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আজ তারা সেই চুরির টাকা এবং তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও ‘স্মার্টফোন’ ব্যবহার করে বিদেশ থেকে জুলাই বিপ্লবকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা পরিকল্পিতভাবে জুলাইয়ের বীরদের ‘ভিলেন’ হিসেবে উপস্থাপন করার একটি সুদূরপ্রসারী নীল নকশা বাস্তবায়ন করছে।” তাঁর এই বক্তব্যে মূলত সেই সব অপশক্তির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যারা প্রবাসে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
গত দেড় দশকের অন্ধকার সময়ের স্মৃতিচারণ করে ডাকসু ভিপি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, বিগত ১৬ বছর এ দেশ গুম, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এক ‘ভাইরাস’ বা বিষবাষ্পে জর্জরিত ছিল। সেই দীর্ঘ নিপীড়ন থেকেই মূলত জুলাই বিপ্লবের জন্ম। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ যে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল, ২০২৪-এর জুলাই মাসে সেই একই অধিকারের লড়াইয়ে বাংলাদেশ আবারও জেগে উঠেছে। তাঁর মতে, জুলাই বিপ্লব কেবল একটি সমসাময়িক আন্দোলন নয়, বরং এটি আমাদের মহান জাতীয় ঐতিহ্যেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আন্দোলনের অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের এক সম্মিলিত ‘প্যাকেজ’ সংগ্রাম। যেখানে ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে রিকশাচালক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী, শিল্পী ও রাজনৈতিক কর্মীরা এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সাদিক কায়েম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, এই বিপ্লব কোনো সুনির্দিষ্ট দল বা একক ব্যক্তির নয়, এটি এ দেশের কোটি কোটি স্বাধীনতাকামী নাগরিকের বিপ্লব। বিপ্লব-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা ও বর্তমানের কিছুটা হতাশা নিয়ে তিনি বাস্তবসম্মত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “৩৬ দিনের আন্দোলন কেবল একটি দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। রাতারাতি কোনো দেশ ন্যায়বিচারের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে না। তবে অর্জিত সাফল্য রক্ষা করে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতেই হবে।”
সম্মেলনটির তাৎপর্য ছিল বিশ্বব্যাপী, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড থটস (আরআইটি)-এর পাশাপাশি কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ রেজিনা’ এবং সিঙ্গাপুরের ‘নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিল। সম্মেলনের শেষে সাদিক কায়েম আহ্বান জানান যে, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে কেবল মৌখিক স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজের মাধ্যমে সম্মান জানাতে হবে। স্বৈরাচারের দোসরদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের যেকোনো সুযোগ রুখে দিতে এবং একটি ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশ গড়তে দ্বিতীয় বিপ্লবের চেতনার বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।