রেল যেন ঠিকাদার আনিসুরের ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’: দোকান থেকে শৌচাগার—সবই তাঁর দখলে!

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের এক মহোৎসবের চিত্র ফুটে উঠেছে। রেলের জমি ইজারা, দোকান বরাদ্দ থেকে শুরু করে স্টেশনের শৌচাগার নিয়ন্ত্রণ—সবখানেই এখন একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন আনিসুর রহমান ওরফে টিপু নামের এক প্রভাবশালী ঠিকাদার। সরকারের পালাবদলের পর কৌশল বদলে বর্তমানে তিনি রেলওয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বাণিজ্যিক লিজের অলিখিত ‘নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এমনকি খোদ কমলাপুর রেলস্টেশনের ভেতরে নকশাবহির্ভূতভাবে একটি বিশাল দোকান বরাদ্দ পাওয়ার ঘটনায় রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, দেশের প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুরের ভেতরে যাত্রীদের বসার জন্য নির্ধারিত একটি খোলামেলা স্থানে কোনো ধরনের ‘টেন্ডার’ বা দরপত্র ছাড়াই আনিসুর রহমানের প্রতিষ্ঠান ‘সিকদার কনস্ট্রাকশন’কে ৪৮০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১২ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই আকর্ষণীয় স্থানটি স্টেশনের মূল নকশায় দোকানের জন্য বরাদ্দ ছিল না এবং অতীতে অনেকেই এখানে দোকান করতে চাইলেও রেল কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দিয়েছিল। অথচ বর্তমান প্রশাসনের আমলে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় এই লাভজনক জায়গাটি পেয়ে গেছেন আনিসুর রহমান। যদিও রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন ইতিপূর্বে দরপত্র ছাড়া দোকান বরাদ্দ না দেওয়ার জন্য একটি দাপ্তরিক চিঠি দিয়েছিলেন, কিন্তু আনিসুরের ক্ষেত্রে সেই ‘ডেডলাইন’ বা নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আনিসুর রহমান নিজেকে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে রেল ভবনে প্রভাব খাটান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে তিনি ক্যাসিনো কাণ্ডে দণ্ডিত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তিনি বর্তমান সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী এবং বিশেষ করে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক মুন্সী রফিকুল আলম মজনুর সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। রফিকুল আলম নিজেও রেলের একজন বড় মাপের ঠিকাদার। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগীয় অঞ্চলে হওয়া ১৯টি দরপত্রের মধ্যে ১৭টি কাজই ভাগ করে নিয়েছেন আনিসুর (১০টি) ও রফিকুল আলম (৭টি)।

শুধু বড় ঠিকাদারি নয়, স্টেশনের শৌচাগার বা ‘পাবলিক টয়লেট’ ইজারাও আনিসুরের করায়ত্তে চলে গেছে। সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া ও জয়দেবপুরসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের শৌচাগার এখন তাঁর নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশনের গাড়ি পার্কিং এলাকাটি আনিসুরের স্ত্রী রেজওয়ানা রহমানের নামে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই ইজারা প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দরদাতাকে বাদ দিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে ‘মজুমদার এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি সংক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ অবশ্য জানিয়েছেন যে, শাহজাহানপুর বা রেল ভবন এলাকায় অনেক ব্যবসায়ীকেই তিনি চেনেন, তবে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। এদিকে আনিসুর রহমান টিপু সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে তাঁর ‘শখ’ হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু তাঁর পরিচিত হলেও তাঁরা কোনো সিন্ডিকেট করে কাজ পান না।

রেলওয়ের এই পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, “ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার ও সরকারি দপ্তরের এই যোগসাজশ স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং বড় ধরনের নীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ। বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুদ্ধাচারের বার্তা দেওয়া হলেও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে এমন অনিয়ম অত্যন্ত হতাশাজনক। এগুলো দ্রুত বন্ধ না করলে সাধারণ মানুষ রেলের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।”


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।