পানি নামতেই বেরিয়ে আসছে ধ্বংসস্তূপ: ৫৪ প্রাণহানি আর হাজার কোটির ক্ষতিতে লণ্ডভণ্ড জনপদ

দেশজুড়ে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের দাপট কিছুটা কমতে শুরু করলেও, পানি নামার সাথে সাথে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনপদগুলোতে দৃশ্যমান হচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞের এক করুণ ও বিভীষিকাময় চিত্র। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বন্যার পানি সরে যাওয়ার সাথে সাথে বেরিয়ে আসছে লণ্ডভণ্ড সড়ক, ভেঙে পড়া সেতু আর বিলীন হয়ে যাওয়া হাজার হাজার বসতঘরের হাহাকার। কোথাও ঘর ধসেছে, কোথাও নষ্ট হয়েছে সারা জীবনের সঞ্চিত ফসল, আবার কোথাও বুকচেরা আর্তনাদ ভেসে আসছে মাছের ঘের হারানো নিঃস্ব কৃষকের কণ্ঠ থেকে।

বান্দরবানের শীলক খালের উত্তর পাড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ পারভেজ ও তাঁর প্রতিবেশী জেবেল মুল্লুকের গল্পটি এখন উপদ্রুত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। ঘর ছাড়ার মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পারভেজ তাঁর চোখের সামনেই বসতঘরটিকে পাহাড়ি ঢলের স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে দেখেন। আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য আর আজীবনের কষ্টার্জিত সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন তাঁরা পথের ভিখারি। ফিরে এসে দেখছেন, যেখানে সাজানো সংসার ছিল, সেখানে এখন কেবলই কাদা আর ধ্বংসস্তূপ।

ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক একটি ‘বাজেট’ বা খতিয়ান তৈরি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায় জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। বান্দরবানের যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও পড়েছে বড় আঘাত; সেখানে ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি সেতু ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতে অন্তত ৭ কোটি এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কারে প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও কয়েক শ কিলোমিটার সড়ক ও অসংখ্য ছোট-বড় কালভার্ট পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি ও মৎস্য খাতে নেমে এসেছে এক কালো অধ্যায়। কক্সবাজারে ১০ হাজার ৪০১ একর ফসলি জমি ডুবে যাওয়ায় প্রায় ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক দিশেহারা। লোহাগাড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে এবং ১ হাজার ৬২০টি পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। খাগড়াছড়ির মহালছড়ির চাষি অজয় বড়ুয়ার মতো অসংখ্য খামারি এখন কীভাবে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তাঁদের অনেকেরই একমাত্র পুঁজি বা ‘স্মার্টফোন’-এ এখন কেবল ঋণের কিস্তির বার্তা আর ধ্বংসের ছবি।

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ‘ক্যাবিনেট’ বা মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ অংশ নেন। সভা শেষে ত্রাণমন্ত্রী জানান, দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা এই বন্যার প্রকোপে পড়েছে। বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং পর্যাপ্ত চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাত জেলার ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো ১০ হাজার ৮৫৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়ে আছেন, যাদের ঘরে ফেরার পথটি এখন কেবলই ধ্বংসের ধূসর স্মৃতি।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।