ট্রাম্পের বিজয় কি তবে সুদূর পরাহত? যে ৭টি ‘কাঁটা’ আটকে দিচ্ছে হোয়াইট হাউসের চূড়ান্ত উল্লাস

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের বারুদে আচ্ছন্ন এবং এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে বড় ধরনের সামরিক সাফল্যের আভাস দিলেও, ট্রাম্পের জন্য এখন ‘বিজয়’ ঘোষণা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রণক্ষেত্রে পরিস্থিতি ক্রমেই আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যে পরিমাণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ইতিহাসে বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট জনসন ও বুশের শাসনামলে হওয়া সামরিক ব্যর্থতার ছায়া এখন ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর পড়তে শুরু করেছে। মূলত ৭টি সুনির্দিষ্ট কারণে ট্রাম্প এই যুদ্ধে এখনই চূড়ান্ত জয়ের দাবি করতে পারছেন না।

১. হরমুজ প্রণালীর শ্বাসরুদ্ধকর সংকট: বর্তমান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান বাধা হলো বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের প্রাণভ্রমরা ‘হরমুজ প্রণালী’। বিশ্ববাজারের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। ইরান এই পথটি কার্যত অচল করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সামরিক সক্ষমতা দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে নিরাপদ রাখা প্রায় অসম্ভব।

২. সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি ও শাসনব্যবস্থা: যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েলি ও মার্কিন যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তবে ট্রাম্পের ধারণা ভুল প্রমাণ করে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি; বরং খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করায় তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে। নতুন নেতার অধীনে ইরান আরও চরমপন্থী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

৩. ইসরায়েলের অনমনীয় অবস্থান: এই যুদ্ধের সমাপ্তি কবে হবে, সেই সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের হাতে নেই। ইসরায়েল তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থে এবং দীর্ঘদিনের শত্রুকে সমূলে বিনাশ করতে এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যেতে চায়। ফলে ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপে পড়ে যুদ্ধ থামাতে চাইলেও মিত্র দেশ ইসরায়েলের ভিন্ন অবস্থানের কারণে তিনি তা পারছেন না।

৪. যুদ্ধের অস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা: ইরান অভিযানের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে। কখনো বলা হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাই মূল কাজ, আবার কখনো ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের। এই দোদুল্যমানতা বা ‘কনফিউশন’ যুদ্ধের সফলতা নির্ধারণে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৫. পারমাণবিক কর্মসূচির রহস্য: ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-র প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটির মতে, ইরানের ইসফাহান পরমাণু কেন্দ্রে এখনো প্রায় ২০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত থাকতে পারে, যা ভবিষ্যতে ইরানকে আবারও পরমাণু শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ দেবে।

৬. ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্থবিরতা: মার্কিন গোয়েন্দাদের বড় একটি হিসাব ছিল যে শীর্ষ নেতাদের হত্যার পর ইরানি জনগণ বিদ্রোহ করে রাস্তায় নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো বড় ‘গণঅভ্যুত্থান’ লক্ষ্য করা যায়নি। বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাইরের আক্রমণ ইরানি জনগণের মধ্যে এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদ তৈরি করেছে যা বর্তমান সরকারকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

৭. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেলের আকাশচুম্বী দাম মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে, যা আসন্ন নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। অভ্যন্তরীণ এই ‘বাজেট’ ও জনমতের চাপ ট্রাম্পকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিচ্ছে।

সার্বিকভাবে, যুদ্ধে নামা যতটা সহজ ছিল, সম্মানজনকভাবে তা থেকে বেরিয়ে আসা ট্রাম্পের জন্য এখন ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কোন পথে হাঁটবেন, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।