অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি চললেও থামেনি মৃত্যুর মিছিল। গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া অস্ত্রবিরতির শর্তাবলীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজায় আবারও রক্তক্ষয়ী তান্ডব চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। সোমবার গাজার মধ্যভাগ ও দক্ষিণাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো ভয়াবহ ড্রোন হামলায় অন্তত ৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক হামলাকে পরিকল্পিত গণহত্যা এবং গাজায় স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ফিলিস্তিনি চিকিৎসা ও হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গাজা উপত্যকার মধ্যভাগে অবস্থিত বুরেজ শরণার্থী শিবির এবং দক্ষিণের খান ইউনিস এলাকায় পুলিশি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এই হামলাগুলো চালানো হয়। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি পুলিশ চেকপোস্টে ইসরায়েলি ড্রোন থেকে করা শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন এবং আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর জখম হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নাসের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহতের এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, বুরেজ শিবিরের প্রবেশপথে একইভাবে চালানো অপর একটি ড্রোন হামলায় আরও দুজন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
হামাসের পক্ষ থেকে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মুখপাত্র হাজেম কাসেম একে ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধের ধারাবাহিকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজার বেসামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর আঘাত হানছে। আল জাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজুম তাঁর এক বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, গাজায় স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার কিংবা জনজীবন পুনর্গঠনের যেকোনো উদ্যোগকে পঙ্গু করে দিতেই ইসরায়েল এখন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পুলিশ বাহিনীকে ‘টার্গেট’ বা লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
সামরিক হামলার পাশাপাশি এবার গাজায় কর্মরত আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর ওপরও নজিরবিহীন প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করেছে ইসরায়েল। জানা গেছে, আগামী ১ মার্চের একটি কঠোর ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে ইসরায়েল অন্তত ৩৭টি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাকে তাদের ফিলিস্তিনি কর্মীদের ব্যক্তিগত ও গোপন তথ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের এমন নির্দেশে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাগুলো। তাদের দাবি, কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দিলে তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং মানবিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলেছে, এই দ্বন্দ্বের জেরে যদি ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তবে গাজার সাধারণ মানুষ এক অবর্ণনীয় ও চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
এদিকে, গাজার অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর যোগান ও চিকিৎসাসেবা নিয়েও চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত বৃহস্পতিবার রাফাহ ক্রসিং দিয়ে মোট ২৮৬টি ট্রাক গাজায় প্রবেশের সুযোগ পেলেও এর মধ্যে মাত্র ১১২টি ছিল জরুরি ত্রাণবাহী সামগ্রী। অথচ বর্তমানে উপত্যকাটির বিধ্বস্ত পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে প্রতিদিন অন্তত ৬০০ ট্রাক সাহায্যের প্রয়োজন। গাজার সীমান্ত কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, হাজার হাজার অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মাত্র গুটিকয়েক মানুষ সীমান্ত পার হতে পারছেন। সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির আবহেও গাজা এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।