যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্য আর চায় না ইসরায়েল? নেতানিয়াহুর ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে জল্পনা

গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এবার ওয়াশিংটনের ওপর থেকে নিজেদের সামরিক নির্ভরতা কমিয়ে আনার এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলিটারি এইড’ বা সামরিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চান। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘সিবিএস নিউজ’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর কৌশলগত পরিবর্তনের আভাস দেন।

সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেন, “আমি চাই যুক্তরাষ্ট্রের এই আর্থিক সামরিক সহায়তা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ করা হোক।” বর্তমানে ওয়াশিংটনের সাথে হওয়া একটি বিশেষ চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল মোট ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল একটি সহায়তা প্যাকেজ পাওয়ার কথা, যার বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার। নেতানিয়াহু মনে করেন, সময়ের দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এই দ্বিপাক্ষিক আর্থিক সম্পর্কের আমূল পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। মার্কিন ডলারের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে ইসরায়েল এখন প্রতিবেশি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরালো করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে পরিবর্তনশীল জনমতকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে খোদ আমেরিকার মাটিতেই ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বর্তমানে ইসরায়েলের নীতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তবে নেতানিয়াহুর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুপরিকল্পিত অপপ্রচার ও বিদেশি প্রভাবের কারণেই বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে নেতানিয়াহু পুনরায় ইরানকে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। তিনি যুক্তি দেন যে, তেহরানের বর্তমান সরকার যদি দুর্বল হয়ে পড়ে বা ক্ষমতার পতন ঘটে, তবে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্যও নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী যখন প্রশ্ন তোলেন—ইরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাত করা কি আসলেও বাস্তবসম্মত? তখন অত্যন্ত কৌশলী উত্তর দেন নেতানিয়াহু। তাঁর ভাষায়, “এটি কি সম্ভব? উত্তর হলো—হ্যাঁ। কিন্তু এটি কি নিশ্চিত? উত্তর—না।”

নেতানিয়াহুর এই নতুন কূটনৈতিক অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসরায়েল ভবিষ্যতে মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই পরিবর্তন কেবল ইসরায়েল-মার্কিন সম্পর্কেই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যেও বড় ধরনের ওলটপালট ঘটাতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।