যন্তর মন্তর নিষিদ্ধের পর এবার আন্দোলন করতেও ভাড়া গুনতে হবে দিল্লিতে: নেপথ্যে কোন পরিকল্পনা?

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রস্থল ‘যন্তর মন্তর’-এ যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ ঘোষণার পর বিকল্প তিনটি স্থান নির্ধারণ করেছে দিল্লি পুলিশ। নির্ধারিত নতুন সমাবেশস্থলগুলো হলো ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। তবে পুলিশ নতুন এই ভেন্যুগুলোর কথা জানালেও সেখানে আন্দোলন বা সভা-সমাবেশ করার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্ব, আকাশচুম্বী ভাড়া, ছায়াহীন পরিবেশ এবং ধর্মীয় উৎসবের মৌসুমে মাঠের প্রাপ্যতাসহ তৈরি হয়েছে নানামুখী কারিগরি ও আর্থিক জটিলতা।

নতুন তিনটি বিকল্পের মধ্যে ভৌগোলিকভাবে রামলীলা ময়দান দিল্লির ক্ষমতার শীর্ষ প্রশাসনিক বলয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থিত হলেও সেখানে যেকোনো কর্মসূচি আয়োজনের ক্ষেত্রে দিতে হবে মোটা অঙ্কের অর্থ। অন্যদিকে শাহদারার সিবিডি গ্রাউন্ডটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এছাড়া বুরারি ময়দান দিল্লির মূল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন ও দূরে যে সেখানে আন্দোলন করলে তা অতীতের যন্তর মন্তরের মতো নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।

দিল্লির বিক্ষোভের কেন্দ্রকে ক্ষমতাশীলদের চোখের আড়ালে ঠেলে দেওয়ার এই পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত লেখক ও দিল্লির নগরজীবনের ইতিহাসবিদ সোহেল হাশমি। তাঁর মতে, অতীতে ইন্ডিয়া গেটের কাছে অবস্থিত বোট ক্লাবের উন্মুক্ত সবুজ চত্বর থেকে সরিয়ে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ নিয়ে যাওয়ার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তটিই ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। এখন সেই স্থানটিকেও নিষিদ্ধ করে বিক্ষোভকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আরও দূরে মফস্বলে সরিয়ে দেওয়া হলে রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ প্রান্তিক মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবি-দাওয়া পৌঁছানো একরকম অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সোহেল হাশমি বলেন, "আগে খোলা জায়গায় মানুষ একত্র হয়ে সরকারের কাছে নিজেদের দাবি জানাতে পারতেন। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছেই কয়েক হাজার, এমনকি কয়েক দশ হাজার মানুষ জড়ো হতে পারতেন। ওয়াশিংটনে মানুষ ক্যাপিটল হিলের ঠিক বাইরেও সমবেত হতে পারেন। তাহলে দিল্লিতে কেন প্রতিবাদকারীদের আরও দূরে সরিয়ে নেওয়া হবে?"

রামলীলা ময়দান: কাছে হলেও খরচের পাহাড় ও ছায়ার অভাব
যন্তর মন্তর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১২ একর আয়তনের ঐতিহ্যবাহী রামলীলা ময়দানটি দিল্লির প্রশাসনিক অঞ্চলের সবচেয়ে নিকটে অবস্থিত। বহু ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উত্থান-পতন, মিছিল ও বড় গণআন্দোলনের সাক্ষী এই মাঠ। তবে নতুন বাস্তবতায় এখানে কর্মসূচি পালন করতে হলে আয়োজকদের গুনতে হবে চড়া আর্থিক মাশুল। দিল্লি পৌর করপোরেশনের (এমসিডি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, এই মাঠে কর্মসূচি আয়োজনে প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত ভাড়া ৫০ হাজার রুপি। এছাড়া ফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে আরও ৫৫ হাজার রুপি অগ্রিম জমা দিতে হবে এবং সেই সঙ্গে নিতে হবে দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের আনুষ্ঠানিক অনাপত্তিপত্র (এনওসি)।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, মাঠটির অর্ধেক অংশ বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ভারী যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য স্থায়ীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাকি অর্ধেক অংশই কেবল ভাড়ার জন্য বরাদ্দ থাকে। তবে কোনো ছোট সংগঠন চাইলেই মাঠের সামান্য অংশ আলাদাভাবে কম খরচে ভাড়া নিতে পারবে না; পুরো নির্ধারিত অংশই পুরো টাকা দিয়ে বুক করতে হবে। ফলে ছোট রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ইউনিয়ন বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে এই মাঠে কর্মসূচি পালন করা চরম ব্যয়বহুল। উপরন্তু, যন্তর মন্তরের মতো গাছপালায় ঘেরা স্নিগ্ধ পরিবেশ এখানে নেই। সুবিশাল খোলা প্রান্তরে পর্যাপ্ত ছায়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দিল্লির তীব্র তাপদাহ ও গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান কর্মসূচি চালানো বিক্ষোভকারীদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এমসিডির আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাঠটি বিভিন্ন আয়োজনের জন্য ২৭ বার বুক করা হয়েছে। বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রামলীলা মেলা ও উৎসবের জোর প্রস্তুতি চলায় এই মৌসুমে সমাবেশের জন্য মাঠটির ফাঁকা স্লট পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

সিবিডি গ্রাউন্ড: তীব্র যানজট ও নাগরিক ভোগান্তির আশঙ্কা
পূর্ব দিল্লির শাহদারায় অবস্থিত ১২ একর আয়তনের সিবিডি গ্রাউন্ডটির দেখভাল করে থাকে দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ডিডিএ)। অভিজাত বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত এই মাঠের চারপাশে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, একাধিক বড় বাণিজ্যিক বিপণিবিতান ও অফিস। ফলে এখানে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজিত হলে আশপাশের এলাকায় নজিরবিহীন ট্রাফিক জ্যাম তৈরি হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পূর্ব দিল্লির আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোর শীর্ষ মোর্চা ‘ইস্ট দিল্লি আরডব্লিউএ জয়েন্ট ফ্রন্ট’-এর প্রধান বি এস ভোহরা জানান, আশপাশের সুউচ্চ ভবন ও সংকীর্ণ ব্যস্ত সড়কের কারণে এই স্থানটি প্রতিবাদের মতো বড় সমাবেশের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত। তিনি বলেন, মাঠের সন্নিকটেই একটি তারকা হোটেল, দুটি বড় বিপণিবিতান, অজস্র বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল এবং ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা রয়েছে। মাঠের ভেতরেও বছরের অধিকাংশ সময় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিয়ের প্যান্ডেল সাজানো থাকে। ভোহরার মতে, আন্দোলনের সময় নিরাপত্তার খাতিরে পুলিশের ব্যারিকেড বসানো ও ট্রাফিক ডাইভারশন দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, যা এই ঘিঞ্জি এলাকায় বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া ডিডিএর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিবিডি গ্রাউন্ডটিও ভাড়ার বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়; সেখানে প্রতিবাদকারীদের কোনো আর্থিক ছাড় দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে দিল্লি পুলিশের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে তারা।

বুরারি ময়দান: বিশাল ক্ষেত্র, কিন্তু কেন্দ্রহীন ‘খোলা কারাগার’
উত্তর-পশ্চিম দিল্লিতে অবস্থিত প্রায় ৫০ একর আয়তনের বিশালাকার বুরারি ময়দান (যা স্থানীয়ভাবে নিরঙ্কারি ময়দান নামেও পরিচিত) আয়তনের দিক থেকে বৃহত্তম। তবে এটি যন্তর মন্তর থেকে আনুমানিক ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সুবিশাল আয়তনের কারণে এখানে লাখো মানুষের জমায়েত সম্ভব হলেও মূল সমস্যা হলো এর জনবিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান।

ইতিহাস বলছে, ২০২৪-২৫ সালের তীব্র কৃষক আন্দোলনের সময়ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন কৃষকদের বুরারি ময়দানে গিয়ে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনরত কৃষক সংগঠনগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বুরারি ময়দানকে ‘খোলা কারাগার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তাদের দাবি ছিল, শহরের মূল কেন্দ্র থেকে এত দূরে এবং চারপাশ কাঁটাতার ও প্রাচীরে ঘেরা জায়গায় আন্দোলনকারীদের আটকে রাখা প্রশাসনের জন্য সুবিধাজনক হলেও মূল লক্ষ্য ভেস্তে যায়; কারণ এতে গোটা আন্দোলন নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়।

গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিবাদের সুযোগ চান গবেষকরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিবাদের জায়গা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল লোকধারণক্ষমতা বিবেচনা করাই যথেষ্ট নয়; বরং যাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সেই ক্ষমতাবানদের কাছে পৌঁছানোর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাসবিদ সোহেল হাশমির স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, "বিক্ষোভস্থল এমন জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে মানুষের কথা শোনা যাবে, সংবাদমাধ্যম সহজে পৌঁছাতে পারবে এবং জনপ্রতিনিধিরা এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।" তিনি স্বীকার করেন যে যন্তর মন্তরে স্থানস্বল্পতাসহ কিছু ব্যবহারিক সংকট ছিল, তবে বুরারি, রামলীলা ময়দান কিংবা সিবিডি গ্রাউন্ডের মতো স্থানগুলো ক্ষমতার মূল বলয় থেকে যোজন যোজন দূরে হওয়ায় তা নাগরিক প্রতিবাদের কার্যকারিতা ও গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার সমতুল্য।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।