চীনা যন্ত্রাংশে ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে হুতিরা, নিশানায় সৌদি-ইসরায়েল

ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। এ কাজে চীনে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা সফল হলে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকায় হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারে গোষ্ঠীটি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ‘খাইবার শেখান’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে নতুন অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে হুতিরা। এই ক্ষেপণাস্ত্র নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। পাশাপাশি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে উড্ডয়নের সময় মাঝ আকাশে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতাও রয়েছে এর। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (সিএআর) অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সিএআরের তথ্য অনুযায়ী, ইরানি নকশা অনুসরণ করে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ১ হাজার ২০০ মাইলের বেশি হতে পারে। এমন সক্ষমতা অর্জন করলে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের পুরো ভূখণ্ডই সম্ভাব্য হামলার আওতায় আসতে পারে।

ইয়েমেনের বড় একটি অংশ বর্তমানে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব এলাকা পুনরুদ্ধারে লড়াই করছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সেনাবাহিনী, যাদের সমর্থন করছে সৌদি আরব। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিনের বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় সৌদি আরবে হুতিদের হামলাও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ইরানে চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি গোষ্ঠীটির আচরণকে ‘খুবই খারাপ’ বলে মন্তব্য করেন।

দুটি চালান জব্দ

ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সিএআর। গত জুলাইয়ে সংস্থাটিকে এসব তথ্য সরবরাহ করে ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ। এর আগে গত বছর হুতিদের দুটি চালান জব্দ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্য পণ্যের আড়ালে ওই চালান দুটিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম পরিবহন করা হচ্ছিল।

জব্দ করা সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন ও মূল কাঠামো তৈরির জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ধাতব যন্ত্রাংশ। এ ছাড়া উড্ডয়নের সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ভারসাম্য ধরে রাখার পাখাও ছিল। তদন্তকারীরা চালানগুলোতে ইরানের ‘খাইবার শেখান’ ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত যন্ত্রাংশ শনাক্ত করেছেন।

এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সরঞ্জাম, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালও জব্দ করা হয়। এসবের মধ্যে ছিল বিশেষ ধরনের তাপরোধী উপাদান, যা উড্ডয়নের সময় প্রচণ্ড তাপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু অংশকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়।

দুই বছর ধরে আমদানির ধারণা

২০২২ সালে ইরান প্রথম ‘খাইবার শেখান’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করে। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায় এবং সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া সম্ভব এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে অস্ত্রটির।

ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা এবং উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা একে প্রতিহত করা কঠিন করে তোলে। ফলে প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

ইয়েমেনের ওপর নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পর্ষদের সাবেক বিশেষজ্ঞ হেনরি টমসন বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-প্রমাণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত দুই বছর ধরে চীন থেকে কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ আমদানি করছে হুতিরা।

তাঁর মতে, মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারলে হুতিরা সৌদি আরবের আরও গভীর অভ্যন্তরে হামলা চালাতে সক্ষম হবে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তুলনায় বেশি বিস্ফোরক বহন করা সম্ভব। এতে গোষ্ঠীটির সামরিক হুমকি আরও বাড়তে পারে।

অস্ত্র সরবরাহে চীনা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সিএআরের অনুসন্ধানে হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তাকারী বিদেশি সরবরাহকারীদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের জন্য পাঠানো যেসব পণ্য এখন পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে, সেগুলোর সবচেয়ে বড় উৎস চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।

হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই চীন থেকে পরিচালিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ হুতিদের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও গোষ্ঠীটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনসহ বিভিন্ন সরবরাহকারীর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করেছে হুতিরা।

গত বছর ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছিল, চীনের একটি প্রতিষ্ঠান লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা চালাতে হুতিদের সহায়তা করেছে।

অন্যদিকে, বেইজিং জানিয়েছে, হুতিদের কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাকে তারা সম্মান করে। তবে চীনের অবস্থান অনুযায়ী, বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হুতিদের আমদানি করা কিছু পণ্য বেসামরিক ও সামরিক উভয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়, আবার কিছু সরঞ্জাম বিশেষভাবে অস্ত্র ব্যবস্থায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়।

আগেও ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহের চেষ্টা

হুতিদের দুটি চালান জব্দের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিদেশ থেকে বিশেষায়িত ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহের চেষ্টা করেছে গোষ্ঠীটি।

২০২৪ সালের শেষ দিকে সিএআরের বিশেষজ্ঞরা স্বল্পপাল্লার ‘সদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একই ধরনের বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্রাংশ আমদানির তথ্য নথিবদ্ধ করেন। তবে ওই যন্ত্রাংশের সরবরাহকারী কে ছিল, তা এখনো জানা যায়নি।

নতুন অনুসন্ধানে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে যন্ত্রাংশ সংগ্রহের প্রচেষ্টা শুধু স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে হুতিদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অগ্রগতি ও চীনা সরবরাহকারীদের সংশ্লিষ্টতার পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।