মাঝরাতে শিশুর কান্নায় দিশেহারা? জাপানে মিলল এক অদ্ভুত ও মানবিক সমাধান

জাপানের আধুনিক ও যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় নবজাতক শিশুকে সামলানো অনেক মা-বাবার জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে রাতের বেলা যখন শিশু একটানা কাঁদতে থাকে, তখন অনেক মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এই নিঃসঙ্গতা দূর করতে এবং অভিভাবকদের একটু বিশ্রামের সুযোগ করে দিতে জাপানের বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠছে বিশেষায়িত ‘নাইটটাইম ক্রাইং ক্যাফে’। এসব ক্যাফে এমন মায়েদের জন্য নিজেদের দুয়ার খুলে দিচ্ছে, যাঁরা রাতের নিস্তব্ধতায় শিশুর কান্নার চাপে নিজেকে অসহায় মনে করেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ‘নাইটটাইম ক্রাইং ক্যাফে’র ধারণাটি কোনো সরকারি পরিকল্পনা থেকে আসেনি। বরং প্রায় এক দশক আগে জাপানের একটি জনপ্রিয় অনলাইন ‘কমিক’ (Comic) বা ব্যঙ্গচিত্রে প্রথম এই কাল্পনিক ভাবনাটি তুলে ধরা হয়েছিল। সেই সময় পাঠকদের মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এক দশকের ব্যবধানে সেই কাল্পনিক ভাবনা এখন বাস্তবের ছোট ছোট ‘কমিউনিটি’ (Community) ভিত্তিক উদ্যোগে রূপ নিয়েছে এবং দেশজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছে। এই ভাবনার মূল কারিগরও বর্তমানে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে অভিভূত।

জাপানের উত্তরাঞ্চলীয় হোক্কাইদোর মেমুরো শহরে এ ধরনের একটি ক্যাফের বাস্তব চিত্র চোখে পড়ে। মেমুরো রেলস্টেশনের পাশেই অবস্থিত ২৮ বছর বয়সী মাদোকা নোজাওয়া’র একটি ক্যাফে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী রবিবার রাতে দোকানটি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও, গত অক্টোবর থেকে মাদোকা এক নতুন নিয়ম চালু করেছেন। প্রতি রবিবার রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত তাঁর ক্যাফেটি খোলা থাকে কেবল ওই সব মায়েদের জন্য, যাঁরা রাতের বেলা শিশুকে নিয়ে বিপাকে পড়েন। মাদোকা এই উদ্যোগের নাম দিয়েছেন ‘ওয়াকো নো কোইয়া’, যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘মা-বাবা ও শিশুর ঘর’।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সেবাটি সম্পূর্ণ ‘বিনা মূল্যে’ প্রদান করা হয়। ক্যাফেতে আসা ৩৪ বছর বয়সী এক নারী, যিনি বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন, দেশ মিডিয়াকে জানান তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। তিনি তাঁর এক ও ছয় বছর বয়সী দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানে এসেছেন। তিনি বলেন, “গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে এবং শিশু কাঁদতে থাকে, তখন খুব একাকী মনে হয়। এখানে এলে অন্তত কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। এটি আমাকে মানসিকভাবে প্রচুর স্বস্তি ও বিশ্রাম দেয়।”

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, জাপানের মতো দেশগুলোতে যেখানে যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমছে এবং একাকী সন্তান পালনের চাপ বাড়ছে, সেখানে এ ধরনের ‘কমিউনিটি’ উদ্যোগগুলো অত্যন্ত কার্যকর। এটি কেবল একটি ক্যাফে নয়, বরং একটি ‘সাপোর্ট সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করছে। ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন বা অনলাইনের বাইরে এমন মানবিক সান্নিধ্য মায়েদের ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’ বা সন্তান জন্মদান পরবর্তী বিষণ্ণতা কাটাতেও সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।