মহাকাশের অতল অন্ধকারে আমাদের পৃথিবী দেখতে কেমন? আর্টেমিস-২ নভোচারীদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর মানবজাতি পুনরায় চাঁদের দোরগোড়ায় পৌঁছে নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী হলো। নাসার ‘আর্টেমিস-২’ (Artemis-II) মিশনের মাধ্যমে গভীর মহাকাশ জয় করে ফিরে আসা চার নভোচারী সম্প্রতি তাঁদের সেই শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা জানান, মহাকাশের সীমাহীন অন্ধকারের মাঝে আমাদের এই পৃথিবী আসলে এক নিঃসঙ্গ কিন্তু অমূল্য ‘লাইফবোট’ (Lifeboat)-এর মতো।

গত শুক্রবার প্রশান্ত মহাসাগরের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে নিরাপদে অবতরণ করে নভোচারীদের বহনকারী ওরিয়ন ‘ক্যাপসুল’ (Capsule)। এরপরই মহাকাশ গবেষণার প্রাণকেন্দ্র হিউস্টনে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, জেরেমি হ্যানসেন এবং ক্রিস্টিনা কোচ। তাঁদের বর্ণনায় উঠে আসে এক মহাজাগতিক একাকীত্ব এবং ঐক্যের আহ্বান।

নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ, যিনি এই অভিযানের মাধ্যমে প্রথম নারী হিসেবে চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণের রেকর্ড গড়েছেন, অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলেন, “মহাকাশে আমাকে কেবল পৃথিবী নয়, বরং এর চারপাশের নিস্তব্ধ অন্ধকারটাই সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে। সেই সীমাহীন কালোর মাঝে আমাদের পৃথিবীটা ছিল নিঃশব্দে ঝুলে থাকা একটি ছোট্ট লাইফবোটের মতো।” তাঁর এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও মানবতার প্রতি এক নতুন সচেতনতার বার্তা দিচ্ছে।

এই অভিযানে যুক্ত ছিলেন একাধিক ঐতিহাসিক মাইলফলক। ভিক্টর গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে গভীর মহাকাশে মানুষের পদচিহ্ন রেখে এসেছেন। হ্যানসেন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষ যেন এই চারজন ক্রুর (Crew) সাহসিকতার মাঝে নিজেদের স্বপ্ন ও সামর্থ্যের প্রতিফলন দেখে। অভিযান চলাকালে নভোচারীরা হাজার হাজার উচ্চ রেজ্যুলেশনের ছবি তুলেছেন, যেখানে ধরা পড়েছে চাঁদের পৃষ্ঠে উল্কাপাতের বিরল দৃশ্য এবং মহাকাশ থেকে দেখা সূর্যগ্রহণ।

নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান এই মিশনকে ‘শৈশবের স্বপ্ন পূরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আর্টেমিস-২ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই অভিযান বিশ্বকে আবারও অসম্ভবকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে।” মূলত এই মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল চাঁদের চারপাশে ‘স্লিংশট’ (Slingshot) কৌশলে ঘুরে আসা এবং গভীর মহাকাশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্টেমিস-২ হলো চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলার প্রথম ধাপ। নাসা পরিকল্পনা করছে ২০২৮ সালের মধ্যে পুনরায় চাঁদের বুকে মানুষের পা রাখার এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব মিশন পরিচালনার জন্য চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করার। এই সফল অভিযান সেই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের পথে এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।