পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নক্ষত্রপতন: চিরবিদায় নিলেন তৃণমূলের ‘চাণক্য’ মুকুল রায়

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নক্ষত্রপতন: চিরবিদায় নিলেন তৃণমূলের ‘চাণক্য’ মুকুল রায়

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুকুল রায় আর নেই। গত রোববার গভীর রাতে কলকাতার নিউটাউনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁর প্রয়াণে ওপার বাংলার রাজনৈতিক মহলে একটি বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। মুকুল রায়ের মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পরপরই শোকের ছায়া নেমে আসে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিচরণক্ষেত্রে।

মুকুল রায় কেবল একজন প্রথাগত রাজনীতিবিদ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও কৌশলী একজন সংগঠক। ১৯৯৮ সালে যখন তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন দল গঠনের সাহসী সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই প্রক্রিয়ার প্রধান কারিগর বা ‘আর্কিটেক্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মুকুল রায়। তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হওয়ার পর তিনি দলটির প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতির জটিল সমীকরণ মেলাতে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাঁকে ‘তৃণমূলের চাণক্য’ বলে অভিহিত করতেন। এমনকি সংগঠনের ওপর তাঁর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও মেধা দেখে অনেকে তাঁকে সিপিএমের কিংবদন্তি সংগঠক অনিল বিশ্বাসের সঙ্গেও তুলনা করতেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৫৪ সালের ১৭ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন মুকুল রায়। তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি কাঁচরাপাড়ার হার্নেট স্কুলে। পরবর্তীতে তিনি নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক এবং তামিলনাড়ুর কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি পূর্ণ উদ্যমে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।

মুকুল রায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ছিল অত্যন্ত নাটকীয় ও বর্ণাঢ্য। দীর্ঘ সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান পরামর্শদাতা হয়ে থাকলেও ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক মহলে চমক তৈরি করেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে কৃষ্ণনগর উত্তর আসন থেকে বিধায়ক (MLA) নির্বাচিত হন তিনি। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় জাহাজ চলাচলবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও অত্যন্ত সুনামের সাথে পালন করেছিলেন। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের মাঝে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি পুনরায় তাঁর পুরনো ঘর অর্থাৎ তৃণমূলে ফিরে আসেন।

মুকুল রায়ের প্রয়াণে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলমতনির্বিশেষে শোক প্রকাশ করেছেন শীর্ষ নেতারা। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ, সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী এবং তৃণমূল সংসদ সদস্য পার্থ ভৌমিক তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র ও সাবেক বিধায়ক শুভ্রাংশু রায়সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও অনুসারী রেখে গেছেন। আজ সোমবারই কলকাতার মাটিতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।