দীর্ঘ কয়েক দশকের প্রবল স্নায়ুযুদ্ধ আর কূটনৈতিক তিক্ততা কাটিয়ে অবশেষে কিউবার সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা অবসানের লক্ষ্যে খুব শীঘ্রই একটি বড় ধরনের সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে ওয়াশিংটন। গত রবিবার (১৫ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন কিউবা তাদের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “কিউবা বর্তমানে একটি সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে অত্যন্ত আগ্রহী। আমি মনে করি খুব দ্রুতই আমরা একটি বড় সমঝোতা সম্পন্ন করব অথবা উদ্ভূত পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরণের ব্যবস্থা নেব।” তবে কিউবার সাথে আলোচনার টেবিলে বসার আগে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের অগ্রাধিকারের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কিউবা ইস্যু নিয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ইরান সংকটের সমাধান করতে চায় তাঁর সরকার। অর্থাৎ ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির তালিকায় ইরান বর্তমানে কিউবার চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে।
বর্তমানে কিউবার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘ কয়েক দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে দেশটি এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল কিউবা এখন নিয়মিত ‘লোডশেডিং’ এবং সরকারি সেবা সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এই চরম সংকটের মুখে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে স্বীকার করেছেন যে, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছেন। তিনি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো সংলাপের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ চিরতরে মিটিয়ে ফেলা। আমি আশা করি এই আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা দীর্ঘকালীন সংঘাতের পথ থেকে সরে আসতে পারব।”
সম্পর্ক উন্নয়নের এই ইতিবাচক আবহের মধ্যেও ট্রাম্পের কিছু মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের রসদ জুগিয়েছে। এর আগে তিনি এক বক্তব্যে দাবি করেছিলেন যে, কিউবা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে এবং দেশটিকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণভাবে দখল’ করা হতে পারে। এমন মন্তব্যের বিপরীতে কিউবাও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। হাভানা জানিয়েছে, যেকোনো আলোচনা বা চুক্তি হতে হবে কিউবার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে পূর্ণ সম্মান জানিয়ে। মার্কিন কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন যে, কিউবাকে যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেতে হয়, তবে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার বা রিফর্মের পথে হাঁটতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন (মাইগ্রেশন), নিরাপত্তা এবং কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল, বর্তমান এই আলোচনার খবরে আঞ্চলিক মিত্র দেশ ও বড় বিনিয়োগকারীরা এখন গভীর আগ্রহ নিয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য মিলন বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণে নতুন কোনো মেরুকরণ ঘটায় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।