ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া সামরিক উত্তেজনা এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, যদি এই সংঘাতের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে বর্তমানের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের প্রখ্যাত জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এড হির্স এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। যদি যুদ্ধের কারণে এই রুট দিয়ে চলাচলকারী তেলের ট্যাঙ্কারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হয় এবং সরবরাহ অর্ধেক কমে যায়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এড হির্স বলেন, “যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাঙ্কারগুলোকে আর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়ে এই প্রণালী পার করাতে পারছে না, তবে সরবরাহে বড় ধরনের ধস নামবে। এমন সংকটে তেলের দাম সাময়িকভাবে ১৫০ ডলারে পৌঁছানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।”
ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এড হির্সের তথ্যমতে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা ‘এলএনজি’ (LNG) বাজারে এই অভিঘাত বেশ স্পষ্ট। যুদ্ধের প্রথম দিনেই এলএনজির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য সোমবার থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এছাড়া ডিজেলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অনেক দেশ যারা দীর্ঘকাল গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন ঘাটতি মেটাতে বিকল্প হিসেবে বড় পরিসরে পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনতে শুরু করেছে। এর ফলে ভবিষ্যতের জ্বালানি সরবরাহের জন্য আগাম যে ‘অর্ডার’ দেওয়া হয়, সেখানেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে।
এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব কেবল ইউরোপ বা এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এড হির্স সতর্ক করেছেন যে, তেলের দামের এই লাগামহীন বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলবে। এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে আসন্ন ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের এমন উচ্চমূল্য ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন এই বিশ্লেষক।
বিশ্বের গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এবং সাধারণ মানুষের পকেটে এই যুদ্ধের প্রভাব কতটুকু দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা এখন নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপর।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।