আধুনিক সভ্যতায় ইন্টারনেট যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদার সমতুল্য, সেখানে এক নজিরবিহীন ‘ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতার’ সাক্ষী হচ্ছে ইরান। দেশটিতে চলমান ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা বা ‘ব্ল্যাকআউট’ এখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম জাতীয় পর্যায়ের ইন্টারনেট শাটডাউনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘নেটব্লকস’ (NetBlocks)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, ইরান সরকার পরিকল্পিতভাবে তথ্যপ্রবাহের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে দেশটিকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানের এই দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট টানা ৩৭তম দিনে পদার্পণ করেছে। মোট ৮৬৪ ঘণ্টা অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে এটি তীব্রতা ও স্থায়িত্বের দিক থেকে বিশ্বের সমজাতীয় সব ঘটনাকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এই দীর্ঘ শাটডাউনের ফলে ইরানের প্রায় ৮ কোটি মানুষ বর্তমানে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন।
নেটব্লকস এই পরিস্থিতিকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তুলনা করে একটি বিশেষ ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। সংস্থাটি বলছে, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পরিস্থিতি এক নয়। উত্তর কোরিয়া কখনোই বৈশ্বিক ইন্টারনেটের মূল ধারার সঙ্গে সেভাবে যুক্ত ছিল না। কিন্তু ইরান ছিল একটি সম্পূর্ণ সংযুক্ত দেশ, যারা বর্তমানে তাদের নিজস্ব একটি ‘জাতীয় নেটওয়ার্কের’ মাধ্যমে সচেতনভাবে নিজেদের বৈশ্বিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এটি মূলত একটি ডিজিটাল দেওয়াল তোলার মতো, যা দেশের ভেতর কী ঘটছে তা বাইরের পৃথিবীকে জানতে দিচ্ছে না।
মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানি ভূখণ্ডে সামরিক হামলা শুরু হওয়ার পরপরই এই কঠোর ‘শাটডাউন’ কার্যকর করে তেহরান। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ রক্ষার কৌশল হিসেবে দাবি করা হলেও বিশ্লেষকরা একে দেখছেন তথ্যের অবাধ প্রবাহ রোধ করার অস্ত্র হিসেবে। উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় কয়েক সপ্তাহব্যাপী একই ধরনের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট কার্যকর করেছিল ইরান প্রশাসন।
এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনলাইন নির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোও দেশটিতে চলমান পরিস্থিতির সঠিক চিত্র যাচাই করতে পারছে না। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ডিজিটাল অচলাবস্থা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।