পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক প্রলয়ংকরী পরিবর্তনের সাক্ষী হলো ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ধূলিসাৎ করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। যে ‘বাঙালিয়ানা’ আর ‘অস্মিতা’র তাস খেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহিরাগত তত্ত্বকে ঠেকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, তা এবার খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ২০২১ সালের ফলাফলের ঠিক ‘মিরর ইমেজ’ বা উল্টো প্রতিচ্ছবি হিসেবে বর্ণনা করছেন। সেবার তৃণমূল ২০০ পার করলেও, এবার বিজেপি ২০০-র গণ্ডি অতিক্রম করেছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থমকে গেছেন আশির ঘরে।
এই মহাবিপর্যয়ের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ কী? আহত বাঘিনীর মতো তিনি কি আবারও ঘুরে দাঁড়াবেন, না কি বয়স আর পরিস্থিতির চাপে রাজনীতির পাদপ্রদীপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবেন? তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। ১৫ বছরের পুঞ্জীভূত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ক্ষোভ যে কেবল ‘জাত্যভিমান’ দিয়ে ঢাকা সম্ভব নয়, এই নির্বাচন তা কড়াভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে।
তৃণমূলের এই পরাজয় দীর্ঘদিনের বহুল আলোচিত ‘দিদি-মোদি সেটিং’ তত্ত্বকেও চিরতরে সমাধিস্থ করেছে। একসময় কানাকানি হতো—‘রাজ্যে কুস্তি, কেন্দ্রে দোস্তি’। অর্থাৎ মমতাকে পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করতে দিয়ে কেন্দ্র স্তরে বিরোধী জোটকে অগোছালো রাখাই ছিল মোদির কৌশল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজেপি যেভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ করে মমতার দুর্গ দখল করেছে, তাতে সেই গোপন আঁতাতের জল্পনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোর (ইডি-সিবিআই) কড়া নজরদারি আর আইপ্যাকের (I-PAC) মতো পরামর্শক সংস্থার হাত গুটিয়ে নেওয়া মমতার পরাজয়কে ত্বরান্বিত করেছে।
এদিকে, হারের পর সর্বভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মমতার অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। জাতীয় স্তরে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও মমতা কখনোই রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে মেনে নেননি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো বিকল্প পথ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত সোমবার ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর রাহুল গান্ধী স্বয়ং মমতাকে ফোন করেছেন এবং তৃণমূল নেত্রীর ‘ভোট চুরির’ অভিযোগকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জাতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে এখন শর্তহীনভাবে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটে শামিল হতে পারেন বিপর্যস্ত মমতা।
তৃণমূলের অন্দরমহলের কানাকানি অনুযায়ী, প্রশান্ত কিশোরের উত্তরসূরি আইপ্যাকের ৪১ হাজার কর্মীই ছিল দলের চোখ ও কান। কিন্তু প্রচারের সময় ইডির হানা এবং সংস্থার শীর্ষ কর্তার গ্রেপ্তারের পর তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য কাজ বন্ধ রাখলে তৃণমূলের কৌশলগত কাঠামো ভেঙে পড়ে। স্থানীয় নেতাদের সাথে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দূরত্ব ঘোচাতে ব্যর্থ এই সংস্থাটির ভবিষ্যৎও এখন চরম অনিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি নতুন কোনো জাদুকরী চালে রাজনীতিতে ফিরবেন, না কি এটিই হবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়—তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো ভারত।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।