নীরবতার এক শৈল্পিক বিপ্লব: লস অ্যাঞ্জেলেসে বসে কীভাবে ‘বাঙলা মূকাভিনয়’কে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাচ্ছেন কাজী মশহুরুল হুদা?

বসন্তের মিঠে রোদ আর লস অ্যাঞ্জেলেসের যান্ত্রিক ব্যস্ততার মাঝেও যখন সময় থমকে যায়, বুঝতে হবে সেখানে কোনো এক শিল্পী তাঁর সৃজনশীলতার ধ্যানে মগ্ন। বলছিলাম বাংলাদেশের মূকাভিনয় জগতের এক প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্র কাজী মশহুরুল হুদার কথা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যে কজন প্রতিভাবান শিল্পীর হাত ধরে মূকাভিনয় বা মাইম শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বর্তমানে হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও তাঁর শিল্পচেতনা আর গবেষণার ধমনীতে আজও বয়ে চলেছে বাংলাদেশের রক্তধারা। দেশ মিডিয়ার পাঠকদের জন্য তাঁর এই বর্ণিল শিল্পযাত্রা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

মশহুরুল হুদার এই নীরবতার ভাষা রপ্ত করার নেপথ্যে রয়েছে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল অডিটোরিয়াম আর বিটিভিতে মার্কিন মাইম কিংবদন্তি অ্যাডাম দারিউসের এক জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখে তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন যে, কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেও হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব। নীরবতাও যে এক প্রচণ্ড শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে, সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি যুক্ত হন প্রখ্যাত নাটকের দল ‘নাট্যচক্র’-এর সাথে। সেখানে তিনি কেবল একজন পারফর্মার হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং দেহভঙ্গিকে কীভাবে একটি স্বতন্ত্র ভাষায় রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে শুরু করেন নিবিড় চুলচেরা বিশ্লেষণ। তাঁর এই বিশ্লেষণধর্মী কাজ পরবর্তীতে বিটিভির পর্দায় দেশজুড়ে এক বিশাল দর্শকশ্রেণি তৈরি করে।

কাজী মশহুরুল হুদার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো ‘বাঙলা মূকাভিনয়’ নামক একটি নতুন ও স্বতন্ত্র শিল্পধারা তৈরি করা। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের মাইম মূলত ফর্ম, কঠোর টেকনিক আর ব্যালেধর্মী শরীরচর্চার ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন এক মূকাভিনয়ের, যা উঠে আসবে আমাদের নিজস্ব লোকজ জীবন আর প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে। এটি কোনো বিদেশি শৈলীর অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বাঙালির সুখ-দুঃখ আর ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বাঙলা মূকাভিনয় গবেষণা কেন্দ্র’। বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রবাসী কমিউনিটিতে তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপ পরিচালনা করছেন।

শিল্পীর মতে, শরীর প্রবাসে থাকলেও মানুষের প্রকৃত সাংস্কৃতিক শিকড় পড়ে থাকে নিজ দেশে, তাঁর স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার অন্দরে। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিটি জাতির উচিত নিজস্ব কৃষ্টিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা, আর মূকাভিনয় হতে পারে সেই প্রচারণার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাঁর বলিষ্ঠ বার্তা—এই শিল্পে টিকে থাকতে হলে কেবল আগ্রহ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নিরন্তর চর্চা আর কঠোর শৃঙ্খলা। লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই শান্ত দুপুরে কথা শেষ করেও তাঁর শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল—কথা শেষ হলেও নীরবতা কখনো শেষ হয় না; বরং তা এক সময়হীন ও সীমানাহীন এক বিশ্বজনীন ভাষার জন্ম দেয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।