পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের অলিগলি থেকে উঠে এসে আজ বিশ্বসংগীতের রাজমুকুট তাঁর মাথায়। অরিজিৎ সিং—এই একটি নামেই এখন বুঁদ হয়ে থাকে কোটি কোটি প্রাণ। তবে সুরের এই সাম্রাজ্য জয় করাটা তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। আজকের এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ লড়াই, আত্মত্যাগ এবং নিজের ওপর চালানো চরম ‘অমানুষিক’ যন্ত্রণার ইতিহাস। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক একান্ত সাক্ষাৎকারে সেই যন্ত্রণাময় দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন স্বয়ং শিল্পী, যা শুনে রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গেছেন তাঁর অগণিত ভক্তকুল।
সাক্ষাৎকারে অরিজিৎ সিং তাঁর পেশাদার জীবনের শুরুর দিকের এক অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে তিনি নিজেই নিজের কণ্ঠস্বর নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। শুধু তা-ই নয়, সেই সময় সংগীত সংশ্লিষ্ট অনেকের কটু সমালোচনা ও তাচ্ছিল্যের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আজ তাঁর কণ্ঠে যে দরদ, আবেগ আর নিখুঁত কারুকাজ আমরা শুনতে পাই, তা আসলে দীর্ঘদিনের কঠোর শ্রমে অর্জিত। অরিজিৎ বলেন, ‘আসলে সেই সময় আমার গলার আওয়াজ অনেকেই পছন্দ করতেন না। তাই অনেকটা স্থাপত্য নির্মাণের মতো করে খুঁতখুঁতে হয়ে আমি নিজের গলাটাকে ভেঙে নতুন করে তৈরি করেছি।’
সাফল্যের এই কারিগর আরও জানান, গলার পেশিগুলোকে কাঙ্ক্ষিত ছাঁচে ফেলতে তিনি নিজের শরীরের ওপর এক প্রকার অত্যাচার শুরু করেছিলেন। অরিজিতের ভাষায়, ‘রেওয়াজ করার সময় আমি সব সীমা ছাড়িয়ে যেতাম। সারা রাত এমনভাবে প্র্যাকটিস করতাম যে, ক্লান্তিতে গলা পুরোপুরি বসে যেত। আমি চেয়েছিলাম আমার গলার পেশিগুলো যেন আমার মনের মতো কাজ করে, আর সেই লক্ষ্য পূরণেই আমি নিজের ওপর কোনো দয়া দেখাইনি।’
প্রায় ১৫ বছরের দীর্ঘ সংগীত জীবনে অরিজিৎ অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছিল ‘আশিকী ২’ সিনেমার গানগুলো। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তবে খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা অবস্থাতেই অরিজিৎ এক চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আপাতত সিনেমার ‘প্লেব্যাক’ বা বাণিজ্যিক গান থেকে বিরতি নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি নিজের মতো করে নতুন ধাঁচের সংগীত সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেছেন। একই সাথে সংগীত জগতের নতুন ও উদীয়মান প্রতিভাদের তুলে ধরতে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ করছেন তিনি। অরিজিৎ চান, তাঁর মতো সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আসা নতুন শিল্পীরা যেন সঠিক সুযোগ পান। নিজের অতীতকে ভুলে না গিয়ে বরং সেই কষ্টকে অনুপ্রেরণায় রূপান্তর করার এই গল্পই আজ অরিজিৎ সিংকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া