পাকিস্তান-আফগানিস্তান ‘ওপেন ওয়ার’

গত এক সপ্তাহ ধরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলা উত্তেজনা এখন আর কেবল সীমান্ত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই; আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা একে অভিহিত করছেন এক ভয়াবহ ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ হিসেবে। গত অক্টোবরে যে সংঘাতকে ‘মিনি ওয়ার’ বলে মনে করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ তা এক বিধ্বংসী রূপ নিয়েছে। আকাশপথে পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং আফগান ড্রোন বাহিনীর পাল্টাপাল্টি আক্রমণে কেঁপে উঠছে কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের প্রধান প্রধান শহরগুলো। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা গুড়িয়ে দিয়ে পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।

এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে কয়েক দশকের পুরনো সীমান্ত বিরোধ ও বর্তমান ভূ-রাজনীতি। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশদের টানা ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ডুরান্ড লাইন’-কে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে পাকিস্তান মেনে চললেও, আফগানিস্তান একে কখনোই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। ঐতিহাসিক আফগান সাম্রাজ্যের সীমানা পুনরুদ্ধারের দাবি আজ দুই দেশের সম্পর্ককে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে গত বছর আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের পর থেকে দিল্লির সঙ্গে কাবুলের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ইসলামাবাদকে রীতিমতো ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিরা আফগানিস্তানের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় গেড়ে পাকিস্তানে একের পর এক আত্মঘাতী হামলা ও নাশকতা চালাচ্ছে। অন্যদিকে কাবুলের দাবি, এটি পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ব্যর্থতা, যা তারা আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায় এড়াতে চাইছে।

তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই যুদ্ধের পেছনে রয়েছে দুই দেশেরই ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর এক সুগভীর কৌশল। পাকিস্তান বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবরণ এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির চাপে দিশেহারা। দেশটিতে কৃত্রিমভাবে জাতীয়তাবাদের হাওয়া তুলে সরকার তাদের রাজনৈতিক বৈধতার সংকট এবং জনগণের ক্ষোভকে যুদ্ধের দিকে ডাইভার্ট বা প্রবাহিত করতে চাইছে। ঠিক একই চিত্র আফগানিস্তানেও পরিলক্ষিত হচ্ছে; ২০২৬ সালের আগস্টে ক্ষমতায় থাকার পাঁচ বছর পূর্ণ করতে যাওয়া তালেবান সরকার দেশে আত্মঘাতী হামলা কমাতে পারলেও চরম দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও বেকারত্ব দূর করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নারীদের ওপর দমনমূলক আইন এবং উত্তরের উজবেক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাত কাবুলকে প্রচণ্ড চাপে রেখেছে।

এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাইরের কোনো শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া উভয় দেশের শাসকদের জন্যই এক ধরনের ‘সেফটি ভালভ’ বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। যদিও গত কয়েক মাসে অন্তত ছয়টি দেশের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার একাধিক চেষ্টা চালানো হয়েছিল, কিন্তু গত শুক্রবার বিকেলের পর সেই শান্তিকামনা এখন পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অশনিসংকেত দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।