থুসিডিডিস ফাঁদ: বেইজিংয়ে ট্রাম্পকে কোন ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা দিলেন শি জিনপিং?

গত বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক হাই-প্রোফাইল শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আলোচনার শুরুতেই শি জিনপিং বৈশ্বিক পরিস্থিতির গম্ভীরতা তুলে ধরে বলেন, ‘বিশ্ব এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।’ তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি ছিল একটি প্রশ্ন, যেখানে তিনি জানতে চান—চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ পেরিয়ে বড় দেশগুলোর সম্পর্কের এক নতুন ও ইতিবাচক ধারা তৈরি করতে পারবে?

কী এই থুসিডিডিস ফাঁদ?
এই ধারণার মূলে রয়েছেন প্রাচীন গ্রিসের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সেনাপ্রধান থুসিডিডিস। তিনি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে দীর্ঘ তিন দশক ধরে চলা ‘পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ’-এর ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। থুসিডিডিসের বিশ্লেষণ ছিল—যখন একটি উদীয়মান শক্তি (তৎকালীন এথেন্স) একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির (স্পার্টা) সমকক্ষ হতে শুরু করে, তখন প্রতিষ্ঠিত শক্তির মনে যে ভয়ের সৃষ্টি হয়, তা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দুই পক্ষকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

আধুনিক যুগে এই ঐতিহাসিক তত্ত্বকে জনপ্রিয় করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসন। ২০১২ সালে তাঁর এক গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, গত ৫০০ বছরের ইতিহাসে এমন ১৬টি ঘটনা ঘটেছে যেখানে একটি উদীয়মান শক্তি প্রতিষ্ঠিত শক্তির মোকাবিলা করেছে। এর মধ্যে ১২টি ক্ষেত্রেই ফলাফল ছিল একটি ভয়াবহ যুদ্ধ। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ে অ্যালিসন যুক্তি দেন যে, ওয়াশিংটন ও বেইজিং বর্তমানে একই ধরনের এক বিপজ্জনক পথে এগোচ্ছে।

শি জিনপিংয়ের দীর্ঘদিনের সতর্কতা:
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই বিষয়টি নিয়ে প্রথমবার কথা বলছেন এমন নয়। ২০১৩ সাল থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এই ‘ফাঁদ’ বা ‘ট্র্যাপ’ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ২০১৫ সালে সিয়াটলে হেনরি কিসিঞ্জারের উপস্থিতিতে তিনি বলেছিলেন, বড় দেশগুলো যদি বারবার ‘স্ট্র্যাটেজিক’ বা কৌশলগত ভুল করে, তবে তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য এমন এক মরণফাঁদ তৈরি করবে যা থেকে বের হওয়া অসম্ভব। এমনকি ২০২৪ সালে জো বাইডেনের সাথে বৈঠকেও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, নতুন কোনো ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ লড়া সম্ভবও নয় এবং উচিতও নয়।

ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:
আমেরিকার নীতি-নির্ধারণী মহলেও এই তত্ত্বের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টার এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস থুসিডিডিসের লেখার বিশেষ অনুরাগী হিসেবে পরিচিত। তবে ট্রাম্পের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে চীনকে শুরুতেই সতর্ক করা মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ।

বর্তমানে তাইওয়ান ইস্যু, দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে যে প্রবল রেষারেষি চলছে, তাতে শি জিনপিংয়ের এই ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ এখন এই ‘ফাঁদ’ এড়ানোর কূটনৈতিক দক্ষতার ওপরই নির্ভর করছে। বেইজিংয়ের এই বৈঠকের পর প্রশ্ন উঠেছে—ট্রাম্প প্রশাসন কি গ্রিক ইতিহাসের সেই রক্তক্ষয়ী পরিণতি থেকে শিক্ষা নেবে, না কি পৃথিবী আবারও এক নতুন মহাযুদ্ধের সাক্ষী হবে?

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।