‘শান্তির দূত’ না কি নতুন বিশ্বযুদ্ধের কারিগর? নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে ইরানে কিসের নেশায় মাতলেন ট্রাম্প?

এক দশক আগে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকা প্রথম) স্লোগান তুলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক আধিপত্য কমানোর যে প্রতিশ্রুতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে এসে তা এক নাটকীয় ও বিতর্কিত মোড় নিয়েছে। যে ট্রাম্প একসময় বিদেশি সরকারকে উৎখাত করার নীতিকে ‘ব্যর্থ’ বলে তুচ্ছজ্ঞান করতেন, আজ সেই ট্রাম্পই তেহরানের শাসনব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে মার্কিন সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ করছেন। নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দাবি করা ট্রাম্পের এই ভোল বদল এখন আন্তর্জাতিক মহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০১৬ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল বিদেশি যুদ্ধ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখা। তিনি বারবার দাবি করেছিলেন যে, তাঁর আমলে কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু হয়নি এবং কমলা হ্যারিস জয়ী হলে বিশ্বকে ‘অজানা দেশের যুদ্ধে’ ঠেলে দেবেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার মাত্র এক বছরের মাথায় ট্রাম্পের নীতিতে আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গতকাল শনিবার ইরানে চালানো হামলাটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের মাত্র এক বছরের মাথায় অষ্টম সামরিক অভিযান। এর আগে তিনি ভেনেজুয়েলার সরকারকে প্রায় অচল করে দিয়েছেন এবং কিউবাতেও একই ধরণের ‘অপারেশন’ চালানোর হুমকি দিয়েছেন।

মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে গত প্রায় ৫০ বছরের পুঞ্জীভূত অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। পারমাণবিক কর্মসূচি, ১৯৭৯ সালের দূতাবাস দখল এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করে তিনি এই হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ক্যালকুলেশন’। কারণ, এর আগেই স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তিনি দাবি করেছিলেন যে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। যদি সত্যিই তা ধ্বংস হয়ে থাকে, তবে কেন এই নতুন ও ভয়াবহ বিমান হামলা—সেই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর হোয়াইট হাউস থেকে মেলেনি।

সবচাইতে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ট্রাম্প এখন সরাসরি ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, সর্বশেষ এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন, যাঁকে তিনি ‘ইতিহাসের সবচাইতে খারাপ মানুষ’ বলে অভিহিত করেছেন। ইরানি জনগণের উদ্দেশে তিনি উসকানিমূলক বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা কাজ শেষ করলে আপনারাই আপনাদের সরকার দখল করুন।’ এমনকি দেশটির পুলিশ ও রেভোলিউশনারি গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি, অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও এই বাহিনীগুলোই ট্রাম্পের চোখে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত ছিল।

ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব কেবল উদারপন্থীদেরই নয়, তাঁর নিজের ‘মাগা’ (MAGA) আন্দোলনের অনেক কট্টরপন্থী নেতাকেও ক্ষুব্ধ করেছে। ডানপন্থী পডকাস্টার টাকার কার্লসন ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জরি টেইলর গ্রিন সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, ট্রাম্প এখন যুদ্ধবাজ ‘নিও-কন’ বা নব্য-রক্ষণশীলদের খপ্পরে পড়েছেন। তবে ট্রাম্পের এই আগ্রাসনের পেছনে কাজ করছে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের কাঠামোগত পার্থক্য। প্রথম মেয়াদে তাঁর চারপাশে এমন অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন যারা তাঁকে চরম কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের পাশে আছেন কেবল ‘ইয়েস ম্যান’ বা অনুগত উপদেষ্টারা, যারা প্রেসিডেন্টের যেকোনো নির্দেশ পালনে দ্বিধা করেন না।

২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া না হওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার নিকোলা মাদুরোকে ধরার অভিযানে সাফল্য ট্রাম্পকে অতি-আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই ভূ-রাজনৈতিক জুয়ার ফল শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তেহরানের শাসন পতন হলে সেখানে লিবিয়ার মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে কি না, কিংবা মার্কিন সেনাদের বড় ধরণের হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হবে কি না—তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। ট্রাম্পের ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ ভাবমূর্তি এখন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।