সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ ও ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের বর্তমান চিত্র নিয়ে একটি সমন্বিত ও বিশেষ জরিপ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিবিএস অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘আইসিটি প্রয়োগ ও ব্যবহারিক জরিপ-২০২৪’-এর ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। তবে আশাবিন্যাস ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এক বিশাল ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ বা বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে।
জরিপ অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারে লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান কিছুটা কমলেও পুরুষ ব্যবহারকারীর সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে দেশে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৫০ দশমিক ২ শতাংশ নারী ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করছেন। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে ভৌগোলিক ব্যবধান নিয়ে। জরিপে দেখা গেছে, শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের হার যেখানে ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে এই হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ শহর ও গ্রামের মধ্যে ৩২ দশমিক ১ শতাংশের এক বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত ডিভাইসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দেশের ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও ব্যক্তিগত মালিকানায় ‘স্মার্টফোন’ বা হ্যান্ডসেট রয়েছে মাত্র ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের। অন্যদিকে, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহারের হার এখনো অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেছে, যা মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রযুক্তি ব্যবহারে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে থাকলেও উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের মতো জেলাগুলো এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী গত তিন মাসে সরকারি চাকরির তথ্য বা ‘স্মার্ট গর্ভন্যান্স’ সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান করেছেন। এছাড়া ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ খেলাধুলার তথ্য খুঁজেছেন। তবে আধুনিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ‘ই-কমার্স’ খাতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে; মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করেছেন। ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশই কেবল ‘কপি-পেস্ট’ বা সাধারণ পর্যায়ের কারিগরি কাজে দক্ষ, যা উন্নত ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পর্যাপ্ত নয়।
জরিপে নাগরিকদের ‘সাইবার নিরাপত্তা’ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রায় ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী দাবি করেছেন যে, তারা সাইবার আক্রমণের শিকার হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। তবে অর্ধেক ব্যবহারকারীই (৫০.৫ শতাংশ) ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ভাইরাস’ ও ‘ম্যালওয়্যার’কে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো ইন্টারনেটের ব্যয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ নাগরিক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে তারা এই সেবা নিয়মিত ব্যবহারে অনাগ্রহী। সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে হলে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং ইন্টারনেটের দাম সাধারণ মানুষের ‘বাজেট’-এর মধ্যে রাখা এবং জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।