বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ যেন কাটছেই না। টানা দুই দিন দরপতনের পর আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই—উভয় ধরনের তেলের দামেই বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং তাঁর একের পর এক পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই এই অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। ট্রাম্পের সর্বশেষ কঠোর হুঁশিয়ারির পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ১০০ মার্কিন ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে।
বাজারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (Brent Crude) দাম প্রতি ব্যারেলে ১ ডলারের বেশি বা ০.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০২.০৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেলের দাম ৭৬ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৯৫.৮৪ ডলারে। অথচ মাত্র এক দিন আগে বুধবারও তেলের বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল।
গত বুধবার (৬ মে) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ঘোষণায় জানান, ইরান যদি প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তি মেনে নেয়, তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে। এই ইতিবাচক বার্তার প্রভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফেরে এবং তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করে। ওই দিন ব্রেন্ট ক্রুড ১০ শতাংশ কমে ৯৮ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ১২ শতাংশ কমে ৮৯ ডলারে নেমে এসেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চুক্তি গ্রহণে ইরান অনীহা প্রকাশ করলে ট্রাম্প তাঁর চিরাচরিত মারমুখী ভঙ্গিতে ফিরে আসেন এবং দেশটিতে আরও ভয়াবহ মাত্রায় বোমাবর্ষণের হুমকি দেন। এই কঠোর হুমকির পরই বাজার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে।
এর আগে গত ২৯ এপ্রিল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২২ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ২০২২ সালের পর বিশ্ববাজারে তেলের সর্বোচ্চ দাম হিসেবে রেকর্ড করা হয়। বর্তমানের এই চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ‘সান সিকিউরিটিজ ইনভেস্টমেন্ট’-এর প্রধান কৌশলবিদ হিরোইউকি কিকুকাওয়া। তিনি মনে করেন, আগামী সপ্তাহে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিকুকাওয়া সতর্ক করে বলেন, “সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেলের দাম এই উচ্চ পর্যায়েই থিতু হবে।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের জন্ম দিচ্ছে। একদিকে যখন সরবরাহ ব্যবস্থা বা ‘সাপ্লাই চেইন’ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে বড় দুই শক্তির প্রেসিডেন্টের আসন্ন বৈঠক তেলের ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। ট্রাম্পের ‘ডেডলাইন’ আর যুদ্ধের হুমকি যদি শি জিনপিংয়ের সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রশমিত না হয়, তবে তেলের দাম মধ্যবিত্ত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।