পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান এই আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশলগত দোদুল্যমানতার চিত্র, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তীব্র বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দশ দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি বক্তব্য দিয়েছেন। আলোচনার শুরুর দিকে তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, এই প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই এবং মার্কিন জ্বালানি চাহিদাও এই পথের ওপর নির্ভরশীল নয়। এমনকি এই সমস্যাটি ইরান ও অন্যান্য দেশের নিজেদের মধ্যে সমাধান করে নেওয়া উচিত বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তাঁর এই অবস্থান তখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
তবে রহস্যজনকভাবে কয়েক দিনের ব্যবধানেই নিজের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যান ট্রাম্প। তাঁর সাম্প্রতিক বয়ানে তিনি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালিই এখন মার্কিন ‘এজেন্ডা’র কেন্দ্রবিন্দু। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই সমুদ্রপথটি জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত না করা পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে কোনো গঠনমূলক আলোচনা সম্ভব নয়। ট্রাম্পের এমন হঠকারী ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যের কারণে মার্কিন বিদেশনীতির প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে খোদ পেন্টাগনের ভেতরেও চাপা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
এরই মধ্যে মার্কিন সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগন দাবি করেছে যে, তাদের বাণিজ্যিক ও যুদ্ধজাহাজগুলো কোনো ধরনের ইরানি বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে এই প্রণালি পার হতে পারছে। তবে ইরান এই দাবির বিপরীতে কিছু কৌশলগত আপত্তি তুলেছে বলে জানা গেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য একটি বড় ‘স্ট্র্যাটেজিক লিভারেজ’ বা কৌশলগত শক্তি। তেহরান এই নিয়ন্ত্রণ সহজে ছাড়তে রাজি নয় এবং এর বিনিময়ে তারা বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করায় ইসলামাবাদে উপস্থিত উভয় দেশের প্রতিনিধি দল পরবর্তী দফার আলোচনার ভিত্তি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এই বড় ধরনের মতপার্থক্য এবং ওয়াশিংটনের অস্পষ্ট নীতি কীভাবে সমাধান হবে, তা নিয়ে এখনও কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ ‘নার্ভ সেন্টার’ নিয়ে চলমান এই রশি টানাটানি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।