মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন ইসরায়েলের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র, ঠিক তখনই খোদ ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বইছে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরায়েলপন্থী একরোখা নীতি এবং যুদ্ধের কারণে খোদ নিজ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন ক্ষোভ ও অসন্তোষ। আর এই সুযোগেই মার্কিন প্রশাসনকে বিঁধতে ছাড়লেন না ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে তিনি সাফ জানিয়েছেন, বিদেশের মাটিতে যুদ্ধ করার চেয়ে আপাতত নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমনে মনোযোগ দেওয়াই হবে তাঁর জন্য বুদ্ধিমানের কাজ।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান এক মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আবহে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি বিশেষ পোস্ট দেন পেজেশকিয়ান। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দানা বেঁধে ওঠা ‘নো কিংস’ (No Kings) বিক্ষোভের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, মার্কিন নাগরিকদের একটি বিশাল অংশ এখন দেশের নীতিনির্ধারণে বাইরের শক্তির—বিশেষ করে ইসরায়েলের—প্রভাব নিয়ে চরম হতাশ ও সংক্ষুব্ধ। তিনি মনে করেন, মার্কিন প্রশাসনের উচিত জনসাধারণের এই ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের বিষয়টি আমলে নেওয়া।
কূটনৈতিক এই উত্তপ্ত বাদানুবাদের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট এক অদ্ভুত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) বিশেষজ্ঞদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা যেন বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি এবং জনমত বিশ্লেষণ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করেন। পেজেশকিয়ানের ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্রের এআই বিশেষজ্ঞদের উচিত ট্রাম্পকে জানানো যে তাঁর দেশের মানুষ ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে শামিল হচ্ছে। মার্কিন নাগরিকেরা ‘ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার’ দেওয়ার ধ্বংসাত্মক নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে।” তিনি আরও যোগ করেন, মার্কিন গণতন্ত্রের ওপর ইসরায়েলি প্রভাব বা তথাকথিত ‘রাজত্ব’ নিয়ে সাধারণ মার্কিনিরা এখন ক্লান্ত ও বিরক্ত।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে এক ভয়াবহ বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই এই সংঘাতের সূত্রপাত। সেই হামলার প্রাথমিক ধাক্কায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। টানা এক মাস ধরে চলমান এই পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
বর্তমানে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। তবে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তারা আলোচনার টেবিলকে স্বাগত জানালেও বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিশ্রুতিতেই তারা পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।