ট্যাব ফেলে কেন বই-খাতায় ফিরছে সুইডেন? ডিজিটাল ক্লাসরুম নিয়ে এক বৈপ্লবিক ‘ইউ-টার্ন’

ট্যাব ফেলে কেন বই-খাতায় ফিরছে সুইডেন? ডিজিটাল ক্লাসরুম নিয়ে এক বৈপ্লবিক ‘ইউ-টার্ন’

আধুনিক শিক্ষার অনস্বীকার্য অনুষঙ্গ হিসেবে গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে ডিজিটাল ক্লাসরুম, শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে ট্যাব এবং অনলাইন ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ (Assignment)। তবে তথ্যপ্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে এক বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ইউরোপের উন্নত দেশ সুইডেন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় দাপট দেখানোর পর দেশটি এখন পুনরায় ঐতিহ্যবাহী বই, খাতা আর কলমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিশুদের মেধা বিকাশ ও মনোযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই ‘ইউ-টার্ন’ নিচ্ছে দেশটির সরকার।


কয়েক বছর আগেও সুইডেন ছিল বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও ‘ডিজিটালাইজড’ (Digitized) শিক্ষাব্যবস্থার রোল মডেল। প্রি-স্কুল থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি ধাপে ‘ট্যাব’ (Tab) ও নানা ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার ছিল বাধ্যতামূলক। তবে সাম্প্রতিক এক নীতিগত সিদ্ধান্তে সুইডেনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রেণিকক্ষে এখন থেকে মুদ্রিত পাঠ্যপুস্তক, কাগজের ব্যবহার এবং হাতের লেখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই পরিবর্তনের লক্ষ্যে সুইডিশ সরকার ইতিমধ্যেই পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণে বিশাল অঙ্কের নতুন বাজেট বরাদ্দ করেছে। তবে নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট করেছেন যে, তারা প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করছেন না; বরং প্রযুক্তিকে শিক্ষার ‘প্রতিস্থাপক’ হিসেবে নয়, কেবল একটি ‘সহায়ক’ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান।


এই বড় ধরনের পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে চিকিৎসা ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ। বিশেষ করে বিশ্ববিখ্যাত ‘ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট’-এর গবেষকরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ‘স্ক্রিন’ (Screen) নির্ভরতা শিশুদের গভীর পাঠ বা ‘ডিপ রিডিং’ (Deep Reading) দক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে। ডিজিটাল ‘ইন্টারফেস’ (Interface) ব্যবহারে শিশুরা অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠলেও, জটিল ও দীর্ঘ কোনো বিষয়বস্তু গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় ডিজিটাল স্ক্রলিংয়ের ফলে তথ্যের ওপর দিয়ে দ্রুত চোখ বুলিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, যা স্মৃতিধারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, কাগজের বইয়ে পড়া এবং হাতে কলমে লেখা মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু ‘স্নায়ুপথ’ সক্রিয় করে, যা মনোযোগ ও দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিশক্তির জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, প্রযুক্তির অধিক ব্যবহারের ফলে শিশুদের হাতের লেখার চর্চা কমে যাওয়ায় তাদের সূক্ষ্ম ‘মোটর স্কিল’ (Motor Skill) বা পেশি সঞ্চালনের ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।


সুইডেন সরকারের এই নতুন পরিকল্পনা ২০২৬ সাল থেকে দেশজুড়ে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। এই প্রক্রিয়ায় কম্পিউটারের বদলে মুদ্রিত বই আর হাতে লেখার ওপর জোর দেওয়া হবে, যাতে শিশুদের বুনিয়াদী শিক্ষা ও সৃজনশীল মনোযোগ পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়। সুইডেনের এই সাহসী সিদ্ধান্ত এখন বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে-শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি শুধুই প্রযুক্তি, নাকি বই-খাতা আর আধুনিকতার সুষম মেলবন্ধন? ডিজিটাল দুনিয়ায় বড় হওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই প্রশ্নটি এখন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।