ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী ও ব্যয়বহুল ব্যাধি কি কেবল খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই প্রতিরোধ করা সম্ভব? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিশ্বখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, জনস হপকিন্স এবং ভারতের আইসিএমআর (ICMR)-এর গবেষকরা এক বিস্ময়কর ইতিবাচক তথ্য দিয়েছেন। তাঁদের মতে, জীবনযাপনে সামান্য পরিবর্তন এবং সঠিক পথ্য বা ‘ডায়েট’ মেনে চললে ক্যান্সারের ঝুঁকি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই বৈপ্লবিক পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে ‘মেটাবলিক রিপ্রোগ্রামিং’ (Metabolic Reprogramming), যা বর্তমান বিশ্বের স্বাস্থ্যখাতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ক্যান্সার কোষগুলোর প্রকৃতি হলো এগুলো অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এর বিভাজনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর শক্তির। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা অতিরিক্ত চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট (যেমন—পিৎজা, বার্গার, কুকিজ বা ময়দার তৈরি খাবার) শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি ইনসুলিন মূলত ক্যান্সার কোষের বিভাজনে প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। গবেষকরা দাবি করছেন, যদি ডায়েট পরিবর্তনের মাধ্যমে এই পুষ্টির জোগান বন্ধ করে দেওয়া যায়, তবে শক্তির অভাবে ক্যান্সার কোষগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তাদের মৃত্যু ঘটে।
সুস্থ থাকতে এবং মারণব্যাধি ক্যান্সার মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা বিশেষ কিছু খাবারকে ‘সুপারফুড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘রঙিন ফল ও সবজি’। গবেষকদের মতে, প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় অন্তত ৫টি ভিন্ন রঙের (লাল, হলুদ, সবুজ, কমলা ও বেগুনি) ফল ও সবজি রাখা জরুরি। গাজর, টমেটো, ব্রকোলি, বিট ও কিউই’র মতো খাবারে থাকা উচ্চমাত্রার ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শরীরের কোষগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করে। বিশেষ করে ব্রকোলি আমাদের ডিএনএ (DNA)-র সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং টমেটোতে থাকা লাইকোপেন পুরুষদের প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে হ্রাস করে।
উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও ভেষজ উপাদানের গুরুত্বও অপরিসীম। ডাল, কাঠবাদাম, চিয়া বীজ, সূর্যমুখী ও তিসির বীজ ক্যান্সার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রুখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়া রান্নায় ব্যবহৃত হলুদের ‘কারকিউমিন’ এবং রসুনের ‘অ্যালিসিন’ ক্যান্সার প্রতিরোধে প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত শক্তিশালী। পানীয় হিসেবে গ্রিন টি-র অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং বেরি জাতীয় ফল শরীরের বিষাক্ত উপাদান দূর করে কোষের সুস্থতা বজায় রাখে।
বিশেষজ্ঞরা হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কেবল উপকারী খাবার খেলেই হবে না, বরং বর্জন করতে হবে ‘সাদা বিষ’ খ্যাত অতিরিক্ত চিনি এবং প্যাকেটজাত বা ‘প্রসেসড ফুড’। বর্তমান সময়ের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে ফাস্টফুডের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় ক্যান্সারের প্রকোপও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে গবেষকদের দেওয়া এই ‘মেটাবলিক রিপ্রোগ্রামিং’ তত্ত্ব সাধারণ মানুষের জন্য যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি এটি ক্যান্সারমুক্ত সুস্থ সমাজ গড়তে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।