জ্বলছে পুলিশের ব্যারিকেড, রণক্ষেত্র প্যারিস: তিন দশকের মধ্যে ফ্রান্সে বৃহত্তম ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার

 জরাজীর্ণ অবকাঠামোর সংস্কার, চরম শিক্ষক সংকট দূরীকরণ এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের জোরালো দাবিতে ফ্রান্সে নজিরবিহীন ছাত্রবিক্ষোভ শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিতে মঙ্গলবার দিনভর কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশটির মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলি থেকে শুরু হওয়া এ ক্ষোভের দাবানল মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ফ্রান্সে, যা বহু স্থানে পুলিশের সঙ্গে সরাসরি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।


আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী প্যারিস ছাড়াও লিয়োঁসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়ে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করলে রাজপথ কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বহু স্থানে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় ব্যারিকেড গড়ে তুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড় ও লাঠিচার্জে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী, পুলিশ সদস্য এবং বিদ্যালয়ের স্টাফ আহত হয়েছেন। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রায় ৯০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম আংশিক বা পুরোপুরি স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে দেশটির ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের দাবি অনুযায়ী, দেশজুড়ে অন্তত দুই হাজার মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।


ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাজধানী প্যারিস ছাড়া কেবল দেশের অন্যান্য অঞ্চলগুলোতেই অন্তত ৮৬ হাজার বিক্ষোভকারী রাজপথে নেমে এসেছিলেন। আর এককভাবে প্যারিসের রাজপথেই আরও প্রায় ২০ থেকে ৪০ হাজার প্রতিবাদী শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।


দেশটিতে এই ব্যাপক অস্থিরতা এমন এক সংবেদনশীল মুহূর্তে শুরু হলো, যখন সরকারের ওপর ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি সামলানোর তীব্র চাপ রয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের ভোট হওয়ার কথা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফ্রান্সের জাতীয় ঋণ পরিশোধের খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলতি শতকের শুরুর দিকের রেকর্ড স্পর্শ করেছে।


উদ্ভূত সংকট নিয়ন্ত্রণে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দো জেফ্রে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সরাসরি ক্ষোভ প্রশমনে একটি অনলাইন গণশুনানি বা মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় জেফ্রে লেখেন, ‘উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা, এবার তোমাদের বলার পালা। তোমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা আমাদের জানাও।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরও যোগ করেন, ‘তোমাদের মতামতের ভিত্তিতেই পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ও সুনির্দিষ্ট সময়সূচিসহ একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে এবং এর জন্য আমরা তোমাদের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করব।’


ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, ফ্রান্সে বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত তহবিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের এমন বিশাল গণজমায়েত সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। পল ভালেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অর্থায়ন বিষয়ক গবেষক ও অধ্যাপক ক্লেমেন্স কার্দোঁ-কাঁ উল্লেখ করেন, সেই সময় সরকার স্কুলজীবন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের মূল সোপান হিসেবে পরিচিত ‘ব্যাকালরিয়া’ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছিল, অথচ স্কুলগুলোতে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা অবকাঠামো বরাদ্দ দেয়নি। সেই আন্দোলনের চাপে তখন সাময়িক বাজেট বাড়লেও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয়ের হার আর টেকসইভাবে বাড়েনি।


শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে; ২০১০ সালে ফ্রান্সে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক গড় ব্যয় যেখানে ছিল ১১ হাজার ৯১০ ইউরো, ২০২৪ সালে এসে তা উল্টো কমে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৬৬০ ইউরোতে। যদিও শিক্ষা খাতে মোট বাজেট ১ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬ হাজার ৫৫৩ কোটি ইউরো হতে যাচ্ছে, তবে মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে এটি মূলত সংকুচিত হয়েছে বলেই মত সংশ্লিষ্টদের।


এমন সংকটাপন্ন সময়ে আগামী নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মেরিন লঁ পেন নিজস্ব ব্যয় সংকোচন নীতি তুলে ধরে আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ঋণসংকটের দ্বারপ্রান্তে থাকা ফ্রান্সে ২০২৭ সালের নির্বাচনে ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নেওয়া হলে দেশ ঋণখেলাপি হয়ে পড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্রান্সের বার্ষিক নিট চাঁদা ৫০০ কোটি ইউরোতে (৫৬১ কোটি মার্কিন ডলার) নামিয়ে আনা এবং বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।


লঁ পেনের লক্ষ্য হলো, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাজেট ঘাটতি ৩ শতাংশে এবং মোট জাতীয় ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনা। পাঁচ বছরের মেয়াদে বাজেটে ১৪ হাজার কোটি ইউরো সাশ্রয়ের রূপরেখা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ফ্রান্সের ‘আস্থা’ ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। গত সপ্তাহে বর্তমান সরকারের ঘোষিত ২০২৭ সালের কাটছাঁট বাজেট প্রস্তাবটি এমনিতেই জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল, আর তার মাঝেই শিক্ষাঙ্গনের এই বিস্ফোরণ ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে দিয়েছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।