জামিনের জন্য কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তদন্ত করবে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন সদ্য পদত্যাগকারী প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে আসামিকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠার পর পুরো অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এই गंभीर অভিযোগকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সকালে প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি রুদ্ধদ্বার জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে, ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, এই অভিযোগের বিষয়ে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালিত হবে।


মঙ্গলবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় অভিযুক্ত হন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। অভিযোগ উঠেছে, সেই মামলায় তাকে জামিনে মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার।


এই দাবির প্রমাণ হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডিং প্রথম আলো ও নেত্র নিউজের হাতে এসেছে। সংবাদমাধ্যম দুটি যৌথভাবে রেকর্ডিংগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর মঙ্গলবার এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা মুহূর্তেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।


প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের বিষয়টি জানার পর ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তাকে উক্ত মামলা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে আর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি এবং ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য দায়িত্ব থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।


এদিকে, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে গতকাল সোমবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় যে, সাইমুম রেজা তালুকদারের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে এবং তাকে প্রসিকিউটরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন।


চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি নিজ বাসভবনে থাকাকালীন এই সংবাদটি দেখেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সকল প্রসিকিউটরকে সকাল ৯টার মধ্যে কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, "আলোচ্য প্রসিকিউটর সম্ভবত দুই বা তিন দিন আগে আমার কাছে একটি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।"


এই ঘটনায় গভীর দুঃখ ও হতাশা প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “আজকে যে নিউজটা এসেছে, তাতে আমি ব্যথিত। যদি কোনো ফরমাল অ্যালিগেশন (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) আমার কাছে আসে, আইনানুযায়ী আমার যতটুকু ক্ষমতা আছে, আমি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।” তিনি আরও स्पष्ट করেন, “যদি ফরমাল অ্যালিগেশন আমার কাছে না-ও আসে, আমি ব্যক্তিগতভাবে, অর্থাৎ আমার চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত আমরা করব।”


শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আরও জানান যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হওয়ার পর থেকে সকল বিষয়ে স্বচ্ছতা যাচাইয়ের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা অসঙ্গতি পাওয়া গেলে, সে বিষয়ে তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন।


উল্লেখ্য, যাকে ঘিরে এই অভিযোগ, সেই সাইমুম রেজা তালুকদার পেশাগতভাবে একজন শিক্ষক ছিলেন এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকার নাগরিক সমাজে তিনি একজন পরিচিত মুখ। ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি থাকলেও, ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়ার পূর্বে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।