চীন আবারও সাক্ষী হচ্ছে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বার্ষিক অভিবাসনের। চন্দ্র নববর্ষ বা ‘লুনার নিউ ইয়ার’ উপলক্ষে কোটি কোটি মানুষের এই বাড়ি ফেরার ধুমকে বলা হয় ‘অ্যানুয়াল মাইগ্রেশন’। চীনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নাড়ির টানে ছুটে চলা এই জনস্রোত কেবল একটি উৎসবের অংশ নয়, বরং দেশটির পরিবহন ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষাও বটে।
চীনা ভাষায় এই বিশাল আকারের ভ্রমণ চাপকে ‘চুনুন’ বলা হয়। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ ৪০ দিনের যাত্রা মূলত চীনের বিশাল ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা অবকাঠামোর কার্যকারিতা বোঝার অন্যতম সূচক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ১৫ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ৯ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যা গতবারের তুলনায় একদিন বেশি। দীর্ঘ এই উৎসবে কেবল পরিবার-পরিজনের সাথে মিলিত হওয়া নয়, বরং পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, ৪০ দিনের এই বিশেষ উৎসবকালীন সময়ে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের সংখ্যা রেকর্ড ৯৫০ কোটি (৯.৫ বিলিয়ন) ছাড়িয়ে যাবে। উল্লেখ্য, গত বছর এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৯.০২ বিলিয়ন। পরিসংখ্যানের এই উল্লম্ফনের পেছনে অন্যতম কারণ হলো জাতীয় ‘এক্সপ্রেসওয়ে’ বা সড়কপথের ভ্রমণকেও এখন থেকে সরকারিভাবে এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চীনের রেলপথে মোট ১.০১ বিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে। এছাড়া উৎসবের প্রথম সপ্তাহে অর্থাৎ ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১৬.৩২ মিলিয়ন যাত্রী যাতায়াত করেছেন।
এ বছর চীনা পর্যটকদের গন্তব্য তালিকায় যেমন বৈচিত্র্য এসেছে, তেমনি পাল্টেছে পছন্দের ধরন। দেশের ভেতরে দক্ষিণাঞ্চলের উষ্ণ দ্বীপ প্রদেশ হাইনান এবং তুষারক্রীড়ার জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চাংবাই পাহাড়ের দিকেই অধিকাংশ মানুষের ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উষ্ণ দেশগুলো শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। রাশিয়ার সাথে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ চালু হওয়ায় সেখানেও ‘টুরিস্ট’দের ভিড় বাড়ছে। তবে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে জাপানে যাওয়ার আগ্রহ এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
চীনের এই উৎসবকে বিশ্ব অর্থনীতিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার ও জ্বালানি তেলের চাহিদা। বর্তমানে চীন তার ভিসামুক্ত প্রবেশ নীতি ৪৫টিরও বেশি দেশে সম্প্রসারিত করেছে, যার ফলে ইউরোপের দেশসহ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পর্যটকরাও এখন ৩০ দিন পর্যন্ত চীনে অবস্থান করতে পারছেন। সব মিলিয়ে, চন্দ্র নববর্ষের এই ৪০ দিন চীন কেবল উৎসবে মাতেনি, বরং বিশ্বকে দেখাচ্ছে তাদের বিশাল পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার এক নতুন ‘মাইলফলক’।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।