খামেনি কোথায়, সব জানেন ট্রাম্প! এনবিসি নিউজে যুদ্ধবিরতি নিয়ে বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার

 দীর্ঘদিন ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আনুষ্ঠানিক অবসানের জন্য একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিকল্প নেই। তবে সেই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে ইরানের জব্দ থাকা শত শত কোটি ডলারের বিপুল সম্পদ কোনোভাবেই অবমুক্ত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই কঠোর বার্তা থেকে এটি স্পষ্ট যে, জব্দ থাকা বিশাল অঙ্কের এই ‘ফান্ড’ নিয়ে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে সহসা কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা নেই।


গতকাল রোববার বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘মিট দ্য প্রেস’-এ দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই মন্তব্য করেন। ট্রাম্প দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ইরানের আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টি কেবল একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর পরই বিবেচনা করা হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘তারা যদি ভালো আচরণ করে, যদি ভালো কাজ করে, তাহলে আমরা আলোচনা শুরু করব।’


অন্যদিকে, তেহরান বরাবরই ইঙ্গিত দিয়ে আসছে যে, তাদের জব্দ থাকা ফান্ডের অন্তত একটি অংশ ছাড় না দিলে কোনো চুক্তিতে সই করা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতীত আলোচনার তিক্ত অভিজ্ঞতা ও গভীর অবিশ্বাসের কারণেই এমন অনড় অবস্থান নিয়েছে তারা। বিশেষ করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র দুই দফা সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত এই কারণেই চলমান যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ইরানি নীতিনির্ধারকেরা চরম মাত্রায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।


গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প দাবি করে আসছিলেন যে, দুই পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, ইরানের স্পর্শকাতর পারমাণবিক কর্মসূচি এবং জব্দ থাকা ফান্ডের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে ‘টেবিল টক’ বা আলোচনায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হওয়ার ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।


এরই মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ট্রাম্প বারবার ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলার কড়া হুমকি দিয়ে চলেছেন। গত শুক্রবার উইসকনসিনের একটি খামারবাড়িতে ধারণ করা এনবিসির ওই সাক্ষাৎকারেও তিনি নিজের মারমুখী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা হয় চুক্তির খুব কাছাকাছি, নয়তো আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালাব।’


বিপরীতে, গত শনিবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ী। তাঁর দাবি, এই আলোচনায় রীতিমতো অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।


জব্দ থাকা ফান্ডের জটিল সমীকরণ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদ জব্দ অবস্থায় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যখন ইরানের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন কথা ছিল এই চুক্তির আওতায় ধাপে ধাপে এসব ফান্ড ব্যবহারের সুযোগ পাবে তেহরান। ওই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল এবং বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর আগের মেয়াদে একতরফাভাবে ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।


ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম শর্ত হিসেবে তেহরান ১২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দ থাকা অর্থ তাৎক্ষণিক ছাড়ের জোর দাবি জানাচ্ছে। তাদের প্রস্তাবিত ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অর্ধেক অর্থ ছাড় করতে হবে এবং বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে পরবর্তী ধাপে। সামরিক উপদেষ্টা রেজায়ী এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টিকে দুই পক্ষের জন্য একটি ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।


খামেনিকে নিয়ে ট্রাম্পের রহস্যজনক মন্তব্য এনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে প্রস্তুত। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর যৌথ হামলা শুরু করে, তখন তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপরই তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের হাল ধরেন। গত ৮ এপ্রিল থেকে বড় ধরনের সংঘাত অনেকটা স্তিমিত থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।


মোজতবা খামেনিকে নিয়ে ট্রাম্প রহস্যজনক মন্তব্য করে বলেন, ‘তিনি কোথায় আছেন, তা আমি জানি কি না-সেটা বলতে চাই না। তবে আমার জানার সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি।’ সংঘাতের শুরুর দিকে মার্কিন হামলায় মারাত্মক আহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।


ট্রাম্প তাঁর সাক্ষাৎকারে আরও স্পষ্ট করেছেন যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো দাবি তিনি তুলছেন না। তবে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান তীব্র হামলার কারণে পুরো যুদ্ধবিরতির আলোচনা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইরান এই হামলার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।


গতকাল রোববার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ বৈরুতে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসী হামলা এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ অবরোধের কড়া জবাবে তেহরান যেকোনো মুহূর্তে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে। একই দিন কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লেবাননের এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ‘সম্পূর্ণভাবে হিজবুল্লাহকেই দায়ী’ মনে করে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।