ইরানের সাথে সংঘাত: ফুরিয়ে আসছে সমরাস্ত্র, ভেঙে পড়ছে অর্থনীতি; কতদিন টিকতে পারবে ইসরায়েল?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের চরম শত্রু হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ছায়া যুদ্ধ প্রকাশ্য ও সরাসরি সংঘাতে রূপ নেওয়ায় নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হলেও, ইসরায়েলের জন্য বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বেশ কঠিন। গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ, লেবানন ও সিরিয়ায় নিয়মিত আক্রমণ এবং ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার ধকল সামলাতে গিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বা আইডিএফ (IDF) ইতিমধ্যে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ইরানের সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


গত শনিবার ইরানে ইসরায়েলি হামলার পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টেছে। ইসরায়েলকে এখন নিয়মিতভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ভীতির মধ্যে থাকতে হচ্ছে। দেশটির তেল আবিব এবং হাইফার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ছে। বারবার বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং হাজার হাজার ‘রিজার্ভ’ সেনাকে তলব করার ফলে বেসামরিক জনজীবনে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি জনগণ, যারা সাধারণত অন্য দেশের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে অভ্যস্ত, তারা এখন দীর্ঘ সময় বাংকার বা শেল্টারে কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।


সামাজিকভাবে বর্তমানে ইসরায়েলে এক ধরনের ‘সামরিক উন্মাদনা’ বিরাজ করছে। ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ শির হেভারের মতে, কয়েক দশক ধরে ইরানকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরার কারণে সাধারণ ইসরায়েলিদের বড় অংশ এখন যুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। এমনকি কট্টর বামপন্থী ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই এখন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পতাকাতলে। তবে শির হেভার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইসরায়েলিদের মনে যে অস্তিত্ব রক্ষার ভয় ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন। এখন মানুষের মধ্যে ভয়ের বদলে একরোখা ‘সামরিক উন্মাদনা’ ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কাজ করছে। এমনকি যুদ্ধের গুটিকয় সমালোচকও প্রধানমন্ত্রীকে যুদ্ধটি ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন, যেন সংঘাতের সময়কাল নিয়ন্ত্রণ করা কেবল ইসরায়েলের একার সিদ্ধান্তের বিষয়।


সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি সমাজ দ্রুত চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির বোমাবর্ষণ ব্রিটিশরা যেভাবে মেনে নিয়েছিল, ইসরায়েলিদের বর্তমান মানসিকতাও ঠিক তেমন। তিনি বলেন, “আমাদের কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে হাইস্কুল ও সেনাবাহিনী-সব জায়গাতেই শেখানো হয় ইরান একটি চরম অশুভ শক্তি।” তবে বার-তালের আশঙ্কা, এই সংঘাত ইসরায়েলকে আরও বেশি সামরিকীকরণ ও ডানপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রকে সবসময় কোনো না কোনো ‘শত্রু’ খুঁজে নিতে হচ্ছে।


সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক হামজে আত্তার জানিয়েছেন, ইরানের মতো সামরিক শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে টিকে থাকা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ইরানের হাতে থাকা বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ফুরানোর আগেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টর রকেট শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আত্তার জানান, সংঘাতের প্রথম তিন দিনেই ইরান ২০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। অথচ এর আগের একটি ১২ দিনের সংঘাতে ইরান সব মিলিয়ে ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।


ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’, ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ‘অ্যারো-২ ও ৩’ ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর রকেটের মজুত অত্যন্ত গোপনীয়। তবে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে এই মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসতে পারে, যা ইসরায়েলকে কেবল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় মনোযোগ দিতে বাধ্য করবে এবং সাধারণ নাগরিকদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। অন্যদিকে, তেহরান বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ১০০টি করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা তাদের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করছে।


অর্থনৈতিক ফ্রন্টেও ইসরায়েল বড় সংকটের মুখোমুখি। ২০২৪ সালে লেবানন ও গাজায় সামরিক অভিযানের ব্যয় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে ঠেকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিশাল ব্যয়ভার দেশটিকে কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাজেটঘাটতির মুখে ফেলেছে, যার ফলে বিশ্বের তিনটি প্রধান ‘ক্রেডিট রেটিং’ সংস্থা ইসরায়েলের রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ শির হেভারের মতে, ইসরায়েল এখন ঋণ, জ্বালানি, পরিবহন এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র উন্নত ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে, তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধসও হয়তো ইসরায়েলের এই আগ্রাসন থামাতে তাৎক্ষণিকভাবে সক্ষম হবে না।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।