কংগ্রেসের অনুমোদন এড়াতেই কি যুদ্ধের ইতি টানলেন ট্রাম্প? উত্তপ্ত ওয়াশিংটন

 ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত ‘সমাপ্ত’ হয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেস নেতাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে সঙ্ঘাতের অধ্যায় আপাতত শেষ, তাই এ বিষয়ে কংগ্রেসের বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়েছে। মূলত মার্কিন আইনের একটি বিশেষ সময়সীমা পার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্পের এমন ঘোষণা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আইনি জটিলতার মূলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট অব ১৯৭৩’। এই আইন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোনো জরুরি হুমকির প্রেক্ষিতে বিদেশে সেনা মোতায়েন বা সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারলেও, ৬০ দিনের মধ্যে তাঁকে কংগ্রেসের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অনুমোদন নিতে হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর ১ মে (শুক্রবার) ছিল সেই ৬০ দিনের ডেডলাইন বা চূড়ান্ত সময়সীমা।

কংগ্রেস নেতাদের পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, আমেরিকানদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিনি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করেছিলেন। তিনি আরও জানান, গত ৭ এপ্রিল তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে আরও বাড়ানো হয়েছে। ট্রাম্পের যুক্তি, ৭ এপ্রিলের পর থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো নতুন গোলাগুলি বা সরাসরি সংঘাত হয়নি। ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন। এর মাধ্যমে ১ মে’র মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার যে আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, প্রেসিডেন্ট তা কৌশলে এড়িয়ে গেলেন। অনেক রিপাবলিকান নেতাও প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা খর্ব করতে না চাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নীরব রয়েছেন।

হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প নিজের অবস্থান আরও কঠোরভাবে তুলে ধরেন। তিনি সরাসরি জানান, কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। তাঁর ভাষায়, ‘এর আগে কখনও এমন অনুমোদন নেওয়া হয়নি’ এবং তিনি ১৯৭৩ সালের এই ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-কে পুরোপুরি ‘অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেন।

তবে প্রেসিডেন্টের এই ব্যাখ্যা মেনে নিতে নারাজ ডেমোক্র্যাট শিবির ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করছেন, ট্রাম্প ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে একনায়কতান্ত্রিক আচরণ করছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেট নেতা চাক শুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে ট্রাম্পের দাবিকে ‘বাজে কথা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “এটি একটি সম্পূর্ণ অবৈধ যুদ্ধ এবং রিপাবলিকানরা চুপ থেকে একে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।”

সিনেটের আরেক প্রভাবশালী নেতা জিন শাহিন বলেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখনো হাজার হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং পরিস্থিতি যেকোনো সময় আবারও উত্তপ্ত হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে, যা মার্কিন অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, কোনো আইনি ভিত্তি বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন।

এদিকে, আমেরিকার প্রভাবশালী মানবাধিকার সংগঠন আমেরিকান সিভিল লিবারটিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) হোয়াইট হাউসে পাঠানো এক চিঠিতে এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্টে কোনো অভিযানের মাঝে এমন ‘বিরতি’ বা ‘রিসেট’ করার কোনো আইনি বিধান নেই। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশল কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা এড়ানোর একটি রাজনৈতিক চাল, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া