মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা: এশিয়ার জ্বালানি বাজারে হাহাকার, এবার কি তবে ত্রাতা হবে আমেরিকা?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে জ্বালানি আমদানিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এশিয়ার দেশগুলোতে। দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল এশীয় দেশগুলো এখন নিরুপায় হয়ে বিকল্প উৎস হিসেবে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে ঝুঁকছে।

বাজার বিশ্লেষণকারী প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ‘আর্গাস মিডিয়া’র সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এশিয়ায় সরবরাহের জন্য মার্কিন ‘লাইট সুইট ক্রুড’ তেলের দাম প্রায় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এই তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৫ মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। কেবল তেলের দামই নয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা ‘এলএনজি’ (LNG) পরিবহনের ভাড়াও চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে ইউরোপের দিকে রওনা হওয়া অন্তত চারটি বড় মার্কিন এলএনজি ‘কার্গো’ মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর দিকে পাঠানো হয়েছে।

সংঘাতের জেরে জ্বালানি সংগ্রহের এই দৌড়ে সবার আগে নাম লিখিয়েছে জাপান। দেশটির তেল শোধনাগারগুলো আগামী জুন মাসের চাহিদা মেটাতে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের ফরমান জারি করেছে। তবে অনেক এশীয় ক্রেতা দেশ এখনো আকাশচুম্বী এই দামে তেল কিনতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। আর্গাস মিডিয়ার এশিয়া অঞ্চলের ‘ক্রুড’ মূল্য বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান এনজি জানান, উচ্চমূল্যের কারণে বাজার এখন চরম অস্থির এবং অনেক দেশ পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

এদিকে, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধানতম ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালী’ ঘিরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। উল্লেখ্য, এশিয়ার মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশই এই স্পর্শকাতর নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মার্কিন সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মঙ্গলবার ওই এলাকায় ইরানের ১৬টি মাইন বসানোর বিশেষ নৌযান ধ্বংস করে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নৌপথে মাইন বসিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা হলে তার ফল হবে ভয়াবহ।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সরবরাহ সংকট দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বর্তমানে তাদের জরুরি ‘রিজার্ভ’ বা মজুত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই মজুত বড়জোর কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। যদিও এশিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এনার্জি অ্যাসপেক্টস’ মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল সরবরাহের ঘাটতি এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে আসন্ন দিনগুলোতে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করা ছাড়া এশিয়ার সামনে আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।