এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে তেহরান: ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় কেন এই মরিয়া সিদ্ধান্ত?

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে উত্তেজনার মেঘ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার সামরিক অভিযানের মুখে আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে চিরতরে বেরিয়ে যাওয়ার পথে হাঁটছে ইরান। তেহরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশটির বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ ইস্পাত কারখানা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একের পর এক হামলার পর এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে টিকে থাকা এখন কেবল ‘সময় ও অর্থের অপচয়’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বিস্ফোরক বার্তায় ইরানের সংসদীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রভাবশালী মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আন্তর্জাতিক চুক্তির অংশ হয়ে থাকা ইরানের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে না। একই সুরে তেহরানের প্রতিনিধি মালেক শারিয়াতি জানিয়েছেন, এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে একটি জরুরি বিল ইতিমধ্যে পার্লামেন্টে জমা দেওয়া হয়েছে। যদিও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পার্লামেন্টের কোনো আনুষ্ঠানিক অধিবেশন বসেনি, তবে এই বিলটি দ্রুত পর্যালোচনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবিত এই বিলে কেবল এনপিটি ত্যাগ নয়, বরং ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির যাবতীয় বিধিনিষেধ বাতিল করার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইরান এখন সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশন (এসসিও) এবং ব্রিকসের মতো শক্তিশালী বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে পরমাণু প্রযুক্তির উন্নয়নে নতুন কৌশলগত চুক্তিতে আবদ্ধ হতে চাইছে। তবে এই বিশাল সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে দেশটির ক্ষমতাধর ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’-এর চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে।

এদিকে, জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ (IAEA)-এর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের সরাসরি আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসিকে ‘অপরাধের সহযোগী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সম্প্রতি গ্রোসি মন্তব্য করেছিলেন যে, পরমাণু যুদ্ধ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা সম্ভব নয়—যাকে উসকানিমূলক হিসেবে দেখছে ইরান।

মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। গত শুক্রবার থেকে ইয়াজদে পরমাণু জ্বালানির প্রধান কাঁচামাল কারখানা এবং আরাকের খন্দাব হেভি ওয়াটার কমপ্লেক্সে বিধ্বংসী বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় বড় ধরনের তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কেবল সামরিক নয়, ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ইসফাহান ও আহভাজের বিশাল সব ইস্পাত কারখানাও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যার ফলে উৎপাদন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।

তেহরানের আকাশ এখন আগুনের কমলা রঙে ঢাকা। স্মরণকালের ভয়াবহতম এই বোমাবর্ষণে শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে প্রায় এক মাস ধরে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। রাজপথে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারির পাশাপাশি চলছে ধরপাকড়। এমনকি জানালা দিয়ে হামলার দৃশ্য রেকর্ড করার অপরাধে এক কিশোরীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ধস—সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ইরান।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।