এক কার্ডেই মিলবে রাষ্ট্রের সব সুবিধা! ভাতার সুশৃঙ্খল বণ্টনে সরকারের ‘ফ্যামিলি ট্রি’ পরিকল্পনা

দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বর্তমান সরকার। প্রথাগত ও খণ্ডিত ভাতা ব্যবস্থার বদলে এখন একটি সুসংহত এবং স্বচ্ছ নেটওয়ার্কিং সিস্টেম গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ (Family Tree)। এই আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি মাত্র ‘স্মার্ট’ কার্ড ব্যবহার করেই একজন নাগরিক রাষ্ট্রের দেওয়া সকল সামাজিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর ‘সোশ্যাল কার্ড’ (Social Card) ব্যবস্থার আদলে বাংলাদেশের সমাজকল্যাণ কাঠামোকে পুনর্গঠন করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

গত বুধবার (২০ মে) সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন সরকারের এই ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রজেক্টের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি জানান, আগামী জুনের মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার মানুষকে এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা বর্তমানে ‘পাইলটিং’ (Piloting) পর্যায়ে রয়েছি। এই স্তরে মাঠপর্যায়ের ছোটখাটো ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর স্থায়ী সমাধান করা হচ্ছে।” গত ১৬ মে চাঁদপুরের ২০টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী জুন মাসে তৃতীয় ধাপে আরও ১৮টি উপজেলায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে।

‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা। একটি একক ডিজিটাল আইডির (Digital ID) মাধ্যমে পুরো পরিবারের একটি ‘ডেটাবেজ’ (Database) জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এই পদ্ধতির ফলে ‘ডাবল বুকিং’ বা এক ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়ার পথ চিরতরে রুদ্ধ হবে। বর্তমানে যারা ৫০০ বা ১০০০ টাকার বয়স্ক বা বিধবা ভাতা পাচ্ছেন, তাঁরা যদি ২ হাজার ৫০০ টাকার এই উচ্চমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিতে চান, তবে তাঁদের পূর্বের ক্ষুদ্র ভাতাটি সারেন্ডার বা ত্যাগ করতে হবে। তবে পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের বিশেষ সুবিধা যেমন—প্রতিবন্ধী ভাতা যথারীতি সচল থাকবে।

ভবিষ্যতে কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডসহ সকল সরকারি পরিষেবাকে এই একটি কার্ডের ভেতরে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর ফলে একটি ‘কিউআর কোড’ (QR Code) স্ক্যান করার মাধ্যমেই উপকারভোগীর যাবতীয় তথ্য এবং তাঁর পরিবারের বর্তমান অবস্থা জানা সম্ভব হবে। এতে করে একজনের টাকা অন্যজনের অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার মতো প্রচলিত জালিয়াতি বন্ধ হবে।

উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ (PMT) মেথডে স্কোরিং করা হচ্ছে। যেখানে আবেদনকারীর জীবনযাত্রার মান, ঘরে টেলিভিশন বা ফ্রিজ আছে কি না কিংবা বসতবাড়ির কাঠামোগত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে স্কোর দেওয়া হয়। যাঁদের স্কোর ৮১৪-এর নিচে থাকে, কেবল সেই ‘অতি দরিদ্র’ পরিবারগুলোই এই কার্ডের জন্য মনোনীত হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, যা সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “সরকার এবং প্রকৃত উপকারভোগীর মাঝখানে কোনো দালাল বা অসাধু চক্রকে সহ্য করা হবে না। অনিয়মের অভিযোগে ইতিমধ্যেই উত্তরাঞ্চলে একজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতিতে অটল রয়েছি।” ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সমন্বিত রূপায়ন বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।