ইরান যুদ্ধে ঘণ্টায় কত খরচ হচ্ছে পেন্টাগনের? ট্রাম্পের ‘এপিক ফিউরি’র চাঞ্চল্যকর হিসাব

 ওয়াশিংটন: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত এক নতুন ও বিধ্বংসী মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর এখন আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করা ওয়াশিংটনের জন্য কতটা টেকসই হবে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই বিশেষ সামরিক অভিযান আগামী চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাসে এক বিশাল অঙ্ক।


অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ ও বর্তমান চিত্র: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানজুড়ে ‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেন। পেন্টাগন এই অভিযানের সাংকেতিক নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে চিরতরে বিরত রাখা এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতা পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেওয়া। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইরানের অভ্যন্তরে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানা হয়েছে এবং তেহরানের ১১টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার পর্যন্ত দেশটির ১৩০টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন।


রণক্ষেত্রে ব্যবহৃত সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র: সেন্টকম জানিয়েছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভাণ্ডারের ২০টিরও বেশি উন্নত ‘অস্ত্রব্যবস্থা’ ব্যবহার করছে। এর মধ্যে আকাশপথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বি-১ ও বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান, এফ-৩৫ ও এফ-২২ এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। এছাড়া এফ-১৫, এফ-১৬ এবং এ-১০ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক যুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ইএ-১৮জি গ্রাউলার। নজরদারির জন্য ‘এডব্লিউএসিএস’ (AWACS) এবং হামলার জন্য এমকিউ-৯ রিপার ও লুকাস একমুখী ড্রোন সক্রিয় রয়েছে। নৌপথে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের মতো দুটি বিশালাকার ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ মোতায়েন করা হয়েছে। প্যাট্রিয়ট এবং থাড (THAAD) এর মতো ‘ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা’ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।


ব্যয়ের অবিশ্বাস্য খতিয়ান: এই অভিযানের সামগ্রিক ব্যয় নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল হলেও সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। তুরস্কভিত্তিক বার্তা সংস্থা আনাদোলুর তথ্যমতে, অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন (৭৭ কোটি ৯০ লাখ) ডলার ব্যয় করেছে। এছাড়া যুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি পর্বে বিমান পুনর্বিন্যাস এবং এক ডজনেরও বেশি নৌযান মোতায়েন করতে অতিরিক্ত ৬৩০ মিলিয়ন (৬৩ কোটি) ডলার খরচ হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির হিসাব অনুযায়ী, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি নৌবহর সাগরে সচল রাখতে প্রতিদিনের খরচ প্রায় ৬৫ লাখ ডলার। এর বাইরে কুয়েতে এক ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা ভুলবশত নিজেদের গুলিতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে, যার প্রতিটির মূল্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার।


বড় সংকট: অর্থ না কি অস্ত্রের মজুত? স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল মনে করেন, ট্রিলিয়ন ডলারের বার্ষিক প্রতিরক্ষা ‘বাজেট’ থাকায় অর্থের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারবে, কিন্তু বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে অস্ত্রের মজুত নিয়ে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ও এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত খুবই সীমিত। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত উচ্চপ্রযুক্তির হওয়ায় এগুলো দ্রুত উৎপাদন করা অসম্ভব। যেহেতু এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ ইউক্রেন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, তাই ইরান ফ্রন্টে এগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার অন্য অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি করতে পারে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে এক কঠিন কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।