খামেনি নিহত হলেও অটুট তেহরান; ইরান যুদ্ধের গোলকধাঁধায় ট্রাম্পের সম্মান বাঁচানোর লড়াই!

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী, আর সেই রণক্ষেত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মার্কিন প্রশাসন এখন এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তেহরানের একটি সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায় নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ডজনখানেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। প্রাথমিক সেই সামরিক সাফল্যকে বড় বিজয় হিসেবে দেখা হলেও, যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে এসে দৃশ্যপট এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা করেছিলেন শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে ইরানি শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে; কিন্তু বাস্তবে তেহরান এখন এক ভয়ংকর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ইরানের সরকার উৎখাত তো দূরের কথা, উল্টো দেশটি এখন তাদের ভৌগোলিক ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমেরিকান অধ্যাপক রবার্ট পেপ তাঁর বিখ্যাত ‘বোম্বিং টু উইন’ বইয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের লড়াইয়ে কেবল ওপর মহলের নেতাদের হত্যা করে বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। ইরান সম্ভবত এই ঐতিহাসিক শিক্ষাটি আগেভাগেই নিয়ে রেখেছিল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি স্পষ্ট করে বলেছেন, গত দুই দশকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন বাহিনীর পরাজয় পর্যবেক্ষণ করেই তাঁরা নিজেদের রণকৌশল সাজিয়েছেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর শূন্যতা তৈরি হতে না দিয়েই দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ বা ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলের কারণে কমান্ড ব্যবস্থা এখনো অটুট। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজের মতে, তেহরান এখন মূলত তিন স্তরের কৌশল প্রয়োগ করছে—টিকে থাকা, পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং যুদ্ধকে এমনভাবে দীর্ঘায়িত করা যাতে তাঁরা নিজেদের শর্ত অনুযায়ী যুদ্ধ শেষ করতে পারেন।

এই পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ‘ডেডলক’ তৈরি করেছে। ইরান তাদের সাশ্রয়ী ড্রোন ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দুবাইয়ের অভিজাত মেরিনা এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোতে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে সংঘাতের আঁচ তুরস্ক, সাইপ্রাস ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সবচাইতে বড় আঘাতটি এসেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালী প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, যা দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়।

জ্বালানি সরবরাহে এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখন গগনচুম্বী। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই জ্বালানির ‘রেশনিং’ শুরু হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কেনিয়ার গুদামগুলোতে অবিক্রীত চায়ের পাহাড় জমেছে কারণ জাহাজ ভাড়া ও বিমার খরচ আকাশ ছুঁয়েছে। তেল আমদানিকারক দেশগুলো তাদের জরুরি মজুত থেকে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি বাজারে ছেড়েও পরিস্থিতির লাগাম টানতে পারছে না।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ব্যাকফুটে। সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এই বিশৃঙ্খলায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিজ স্বীকার করেছেন যে, ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগতভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরণের ঘাটতি ছিল। কানাডার লাভাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন প্যাকুইনের মতে, ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সাফল্যে ওয়াশিংটন সম্ভবত ‘অতি-আত্মবিশ্বাসী’ হয়ে পড়েছিল।

বর্তমানে ট্রাম্প এক দ্বিমুখী চাপের মুখে। একদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে গিয়ে পেন্টাগনের অত্যন্ত দামী ‘পেট্রিয়ট’ ও ‘থাড’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, অন্যদিকে সামনেই মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচন। জ্বালানির দাম বাড়ায় সাধারণ ভোটাররা ক্ষুব্ধ, যা রিপাবলিকান প্রতিনিধি ও সিনেটরদের আসন হারানোর শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

আইএফআরআই গবেষক ক্লেমেন্ট থার্মের মতে, ইরান হয়তো একটি ‘জম্বি স্টেটে’ পরিণত হচ্ছে যেখানে সরকার কোনোমতে টিকে থাকলেও সাধারণের বেতন দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। তবে ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী বড় ধরণের কোনো ‘গণঅভ্যুত্থান’ এখনো দৃশ্যমান নয়। এমতাবস্থায় ট্রাম্প হয়তো এখন ‘বিজয়’ শব্দের সংজ্ঞাই বদলে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ঘোষণা থেকে সরে এসে তিনি হয়তো দাবি করবেন যে খামেনিকে হত্যা করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তবে আটলান্টিক কাউন্সিলের নেট সোয়ানসন মনে করেন, ইরান হয়তো ট্রাম্পকে এত সহজে যুদ্ধ থেকে বের হতে দেবে না। ট্রাম্পের সামনে এখন কেবল দুটি কঠিন পথ— হয় সরাসরি স্থল আক্রমণ করা অথবা ইরানি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সশস্ত্র করে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বা দাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়া। আপাতত এই সংঘাতের লেলিহান শিখা মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্ত ছাড়িয়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে গেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।