দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মরণফাঁদে ইসরায়েল: অপরাজেয় শক্তির আড়ালে কি লুকিয়ে আছে বড় পতনের সংকেত?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে যুদ্ধের দামামা যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হচ্ছে ইসরায়েল। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দাবি করছে যে, দীর্ঘমেয়াদী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে; তবে ইসরায়েলের জন্য বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চরম উদ্বেগজনক। গাজায় চলমান নজিরবিহীন জাতিগত নিধনযজ্ঞ, লেবানন ও সিরিয়ায় বহুমুখী ফ্রন্টে সংঘাত এবং ইরানের সাথে সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন রীতিমতো ক্লান্ত ও অবসন্ন। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তেল আবিবের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রমাণিত হতে পারে।

গত শনিবার ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় নিয়মিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে। এর ফলে হাইফা ও তেল আবিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত বিমান হামলার সতর্কবার্তা বা সাইরেন বাজছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি হাজার হাজার রিজার্ভ সেনাকে নতুন করে তলব করতে হয়েছে। ইসরায়েলি নাগরিকরা, যারা সাধারণত অন্যদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে অভ্যস্ত, তারা এখন দীর্ঘ সময় বাংকার বা শেল্টারে কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। জরুরি পরিষেবাগুলো এই পরিস্থিতির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। যদিও বর্তমানে দেশটির কট্টর বামপন্থী বাদে প্রায় সব রাজনৈতিক দল সরকারের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ এবং জনগণের মধ্যে এক ধরণের ‘সামরিক উন্মাদনা’ কাজ করছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই জোয়ার ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ শির হেভারের মতে, এবারের যুদ্ধ ২০২৫ সালের জুনের সেই ১২ দিনের সংঘাতের মতো নয়। তখন মানুষের মনে অস্তিত্ব রক্ষার ভয় ছিল, কিন্তু এখন কাজ করছে একরোখা সামরিক উন্মাদনা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড্যানিয়েল বার-তাল বিষয়টিকে আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ইসরায়েলি সমাজ এখন চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী পর্যন্ত—সব স্তরেই ইরানকে একটি ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এই উগ্র জাতীয়তাবাদের চাপে এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ইসরায়েলের অনেক মেধাবী তরুণ এখন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ‘তলোয়ারের ওপর ভর করে বাঁচার’ নীতি ইসরায়েলকে এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সামরিক শক্তির দিক থেকেও ইসরায়েলকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তার আল-জাজিরাকে জানান, ইরানের মতো বিশাল আয়তন ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের প্রথম তিন দিনেই ইরান ইসরায়েলের দিকে ২০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে একটি করে বহুমূল্য ‘ইন্টারসেপ্টর’ রকেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। আত্তারের মতে, মার্কিন সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল এতদিনে তাদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরান বর্তমানে প্রতি মাসে অন্তত ১০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মজুতকে দ্রুত নিঃশেষ করে দিতে পারে।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিষয়টিও এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা গাজা ও লেবানন অভিযানে ইসরায়েলের রাজকোষে বড় ধরণের টান পড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই অভিযানে ইসরায়েলের ব্যয় ছিল ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে। এই বিশাল ব্যয় দেশটিকে নজিরবিহীন বাজেট ঘাটতির মুখে ফেলেছে। ফলে ২০২৪ সালে বিশ্বের তিনটি প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। শির হেভার সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল এখন ঋণসংকট, জ্বালানিসংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের একটি চক্রে আটকা পড়েছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি উন্নত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে, তবে এই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ইসরায়েল তাদের আগ্রাসন চালিয়ে যেতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।