পবিত্র নগরী জেরুজালেমের ঐতিহাসিক ওল্ড সিটি বা প্রাচীন জনপদে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়ে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে ইসরায়েল সরকার। বিশ্ব মুসলিমের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদের গা-ঘেঁষে অবস্থিত ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন বহু পুরনো ও মূল্যবান সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে এগিয়ে নিচ্ছে তেল আবিব। ফিলিস্তিনি জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে জেরুজালেমের শত বছরের পুরনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বদলে দেওয়ার এক সুগভীর ও দীর্ঘমেয়াদী ‘ইহুদিকরণ’ ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করছেন।
ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা সম্প্রতি একটি অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই কমিটির মূল লক্ষ্য হবে আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল পথ ‘বাব আল-সিলসিলা’ (চেইন গেট) এলাকার ফিলিস্তিনি সম্পত্তিগুলো রাষ্ট্রের অধীনে নেওয়া। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলো এই পদক্ষেপকে ওল্ড সিটিতে ইসরায়েলের ‘সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা’ এবং জাফা গেট থেকে শুরু করে ইহুদি কোয়ার্টার ও ওয়েস্টার্ন ওয়ালের (পশ্চিম দেয়াল) মধ্যকার সংযোগ পথকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আওতায় আনার একটি প্রয়াস হিসেবে দাবি করছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকেই তথাকথিত ‘জনস্বার্থ’ আইনের দোহাই দিয়ে এই সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করার আদেশ ঝুলে ছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা আইনি লড়াই এবং কৌশলগত জটিলতার অবসান ঘটিয়ে এখন সেগুলো চূড়ান্তভাবে দখলে নিতে চাইছে নেতানিয়াহু সরকার। জেরুজালেম পৌরসভা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই রায়ের ফলে বাব আল-সিলসিলা এলাকার অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরাসরি উচ্ছেদের মুখে পড়বে।
আল-আকসা মসজিদের খতিব ও বিশিষ্ট আলেম শেখ একরিমা সাবরি এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে দেশ মিডিয়াকে জানিয়েছেন, বাব আল-সিলসিলা সড়কটি কেবল একটি পথ নয়, বরং এটি ইসলামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সরু পাথুরে সড়কের দুই পাশে মামলুক ও অটোমান সাম্রাজ্যের আমলের অসংখ্য প্রাচীন স্কুল, মাদ্রাসা এবং ভবন রয়েছে, যা মূলত ওয়াকফ সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। তিনি আক্ষেপের সাথে বলেন, “দখলদারদের প্রতিটি পদক্ষেপই জেরুজালেমের ইসলামী ঐতিহ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকানোর নামান্তর।”
জেরুজালেম বিশেষজ্ঞ খলিল তাওফিকজি এই বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়ার আইনি কূটচাল ফাঁস করে বলেন, ইসরায়েল সবসময়ই স্কুল বা হাসপাতালের মতো জনকল্যাণমূলক কাজের অজুহাত দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়। তাঁর মতে, এখানে ‘জনস্বার্থ’ বলতে কেবল ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক দশকে বহু ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ওইসব ভবনের উপরের তলায় ইহুদিদের বসতি স্থাপন করা হয়েছে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গাজার চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাসীর নজর যখন রণক্ষেত্রের দিকে, ঠিক সেই সুযোগেই ইসরায়েল জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে চাইছে। এই আগ্রাসী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে জর্ডান প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াই শুরু করেছে। নবগঠিত ইসরায়েলি কমিটি আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেবে, যা জেরুজালেমের স্থিতিশীলতাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।