আধুনিক বিশ্বের নতুন মহামারি ‘নিঃসঙ্গতা’: ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীরাই কি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

আধুনিক বিশ্বের নতুন মহামারি ‘নিঃসঙ্গতা’: ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীরাই কি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

আমরা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের যুগে বাস করছি। আমাদের চারপাশ এখন শব্দ, মানুষ আর যোগাযোগের অগণিত ‘ডিজিটাল’ মাধ্যমে ঠাসা। হাতের মুঠোয় থাকা ‘স্মার্টফোন’ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে মুহূর্তেই পৃথিবীর অপর প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম সংযুক্তিরকালেও বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতার অনুভূতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানী ও গবেষকরা একে ‘নিঃসঙ্গতার মহামারি’ হিসেবে অভিহিত করছেন।


নিঃসঙ্গতা একটি আপেক্ষিক বিষয়, যা একেকজন মানুষের কাছে একেকভাবে ধরা দেয়। কারো কাছে এটি জনাকীর্ণ ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আগন্তুক মনে করা, আবার কারো কাছে এটি দীর্ঘ সম্পর্কের ভেতরে থেকেও মানসিক সংযোগের অভাব। বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী স্যাম কার-এর মতে, মানুষ নিজেই অনেক সময় নিঃসঙ্গতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি মানুষকে ‘ধাঁধার টুকরো’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যখন আমরা আমাদের প্রকৃত সত্তাকে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারি না বা স্বীকৃতি পাই না, তখনই সম্পর্কের গভীর থেকে একাকীত্বের জন্ম হয়।


সাধারণভাবে মনে করা হয়, বিয়ে বোধহয় নিঃসঙ্গতার চিরস্থায়ী সমাধান। কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। অর্ধশতাব্দী ধরে সংসার করার পরও সঙ্গীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ না পেয়ে অনেকে চরম একাকীত্বে ভোগেন। ২০২১ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ শহর ও যান্ত্রিক পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে নিঃসঙ্গতার মাত্রা অনেক বেশি। অথচ প্রযুক্তির কল্যাণে তাদের হাতে যোগাযোগের হাজারো বিকল্প রয়েছে। ২০১৮ সালে বিবিসির ‘লোনলিনেস এক্সপেরিমেন্ট’-এ অংশ নেওয়া ৫৫ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৪০ শতাংশই নিয়মিত বা তীব্র নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বর্তমানে এই মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।


লন্ডনের কিংস কলেজের ইতিহাসবিদ ফে বাউন্ড আলবার্টি মনে করেন, নিঃসঙ্গতা কেবল একটি অনুভূতি নয়, বরং এটি রাগ, দুঃখ ও ঈর্ষার মতো নানা আবেগের একটি জটিল সংমিশ্রণ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, ১৯ শতকের আগে ‘লোনলি’ বা একাকী শব্দটি মূলত নির্জনতাকে বোঝাত, যা নেতিবাচক ছিল না। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘আই ওয়ান্ডারড লোনলি অ্যাজ আ ক্লাউড’ কবিতায় একাকীত্বকে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক নগরায়ণ, ধর্মীয় কাঠামোর শিথিলতা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এই শব্দটিকে যন্ত্রণাদায়ক করে তুলেছে।


ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অলিভিয়া রেমেস-এর মতে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিল থেকেই নিঃসঙ্গতার উৎপত্তি। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও বাতলে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদি নিঃসঙ্গতার পার্থক্য বুঝতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যাতায়াতের পথে সামান্য কথোপকথনও মনকে প্রফুল্ল করতে পারে। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবী মূলক কাজ এবং প্রিয়জনের সান্নিধ্য বা শারীরিক স্পর্শ একাকীত্ব কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। এমনকি প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকলে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি প্রায় ২৮ শতাংশ কমে যায় বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, নিঃসঙ্গতা যদি দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে দেরি না করে পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া জরুরি।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।