বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে অবিশ্বাস্য অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই পাচারের আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার (১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এই বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেন। সংসদ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল তার প্রথম প্রশ্নোত্তর পর্ব।
এদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। পাচার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থ গড়ে প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান, যা বর্তমান দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা।
সংসদ নেতা তার বক্তব্যে জানান, এই বিশাল অর্থ শুধু একটি নির্দিষ্ট দেশে নয়, বরং বিশ্বের একাধিক দেশে ছড়িয়ে আছে। পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে সরকার ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্যের আদান-প্রদান, সম্পদ চিহ্নিতকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা (এমএলএটি) নিশ্চিত করতে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী অর্থপাচারের প্রধান গন্তব্য হিসেবে ১০টি রাষ্ট্রকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। এই দেশগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীন। তিনি জানান, এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং-চীন ও আরব আমিরাতের সাথে আইনি সহায়তার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি মিলেছে। বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে দ্রুত চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের আইনি পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১১টি বড় অর্থপাচারের মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) এসব মামলা পরিচালনা করছে।
বিদেশে ও দেশের অভ্যন্তরে সম্পদ জব্দের পরিসংখ্যান দিয়ে সংসদ নেতা জানান, আদালতের নির্দেশে এখন পর্যন্ত দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকা মূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশের মাটিতেও ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের তৎপরতায় প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারে এখন পর্যন্ত মোট ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল সম্পন্ন হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় ইতিমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করে তিনি বলেন, বিগত আমলের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার করা এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, যা বাস্তবায়নে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।