ঢাকার বুকে যেন ব্রাজিলের ‘সিটি অব গড’: মোহাম্মদপুরের অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে কী?

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মোহাম্মদপুর কি ধীরে ধীরে ঢাকার ‘সিটি অব গড’ হয়ে উঠছে? গত ১২ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি শিউরে ওঠা ভিডিও চিত্র এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণকে প্রকাশ্য দিবালোকে ধাওয়া করছে একদল প্রতিপক্ষ। জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে গিয়ে একটি দোকানের সামনে পড়ে গেলে তাঁকে ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপানো হয়। একপর্যায়ে নৃশংসভাবে তাঁর বাম পায়ের গোড়ালি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। পরে জানা যায়, নিহত ওই তরুণের নাম ইমন হোসেন, অপরাধ জগতে যাঁর পরিচিতি ছিল ‘অ্যালেক্স ইমন’ নামে।

পুলিশি রেকর্ড অনুযায়ী, ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ অন্তত ১৮টি মামলা ছিল। তিনি ছিলেন কুখ্যাত ‘অ্যালেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ইমনের এই পরিণতি যেন ২০০২ সালের বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান চলচ্চিত্র ‘সিটি অব গড’-এর বাস্তব চিত্রায়ন। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর সেই বস্তির মতো মোহাম্মদপুরও এখন অপরাধী দলগুলোর এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে, যেখানে আইনের শাসনের চেয়ে গ্যাং কালচারের দাপটই বেশি দৃশ্যমান।

ডিএমপির তথ্যমতে, মোহাম্মদপুর এলাকায় বর্তমানে ছোট-বড় প্রায় অর্ধশত অপরাধী চক্র সক্রিয়। এর মধ্যে পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ এবং কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপের মতো অন্তত ১৭টি শক্তিশালী ‘গ্যাং’ পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। প্রতিটি দলে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন করে প্রশিক্ষিত সদস্য রয়েছে, যাদের আয়ের প্রধান উৎস মাদক সিন্ডিকেট, দখলবাজি ও কন্টাক্ট কিলিং।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের এই অস্থিরতার শিকড় অনেক গভীরে। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই জনপদটি নব্বইয়ের দশকে জোসেফ, হারিস এবং পিচ্চি হেলালের মতো ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের’ উত্থান প্রত্যক্ষ করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক স্থবিরতাকে কাজে লাগিয়ে এই চক্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশি পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ মাসে মোহাম্মদপুরে গ্যাং সংঘাতের জেরে অন্তত ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল মাদক ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে খুন হন সাত মামলার আসামি আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল।

গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মোহাম্মদপুরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং অধিক জনঘনত্ব অপরাধীদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের বসবাস এবং পাশের বুড়িগঙ্গা নদী অপরাধীদের দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। এছাড়া জেনেভা ক্যাম্পের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো মাদক ব্যবসার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আবাসন ব্যবসার বিশাল অংকের ‘ব্ল্যাক মানি’ এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা স্থানীয় নেতাদের আস্ফালন এই অপরাধপ্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের মতে, কেবল ধরপাকড় করে মোহাম্মদপুরের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “এখানে ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ পুলিশিং এবং দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অপরাধ করে কেউ যেন পার না পায়, সেটি নিশ্চিত করতে না পারলে এই এলাকাকে অপরাধমুক্ত করা কঠিন হবে।” বর্তমানে সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে বিরাজ করছে এক অজানা আতঙ্ক। দীর্ঘ চার দশক ধরে বসবাস করা অনেক প্রবীণ নাগরিক এখন নিরাপত্তা শঙ্কায় নিজের নাম প্রকাশ করতেও দ্বিধাবোধ করেন। তাদের কেবল একটিই আর্তি—মোহাম্মদপুর যেন আর ‘সিটি অব গড’ না হয়ে পুনরায় সাধারণ মানুষের বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া