ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ও যখন রক্ষা কবজ নয়: চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘অলআউট’ অ্যাকশন

সারা দেশে পেশাদার অপরাধী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন ও সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কঠোর হুঁশিয়ারির পর শুরু হওয়া এই অভিযানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবকেই তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এমনকি ক্ষমতাসীন দল বা জোটের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে রেহাই পাচ্ছেন না কেউ। গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া এই সর্বাত্মক অভিযানে ইতিমধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, যা জনমনে নতুন এক আশার সঞ্চার করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়ার পরই পুলিশ ও র‍্যাব সম্মিলিতভাবে তালিকা হালনাগাদ করে এই ‘অলআউট’ অ্যাকশনে নেমেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার এক দিনেই রাজধানীতে ১৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ৩৫ জন তালিকাভুক্ত শীর্ষ চাঁদাবাজ। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম ৫ দিনেই মোট ৫৪৬ জন চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন, কোনো অপরাধীর জন্যই কোনো ধরনের রাজনৈতিক তদবির গ্রহণ করা হবে না। কেউ যদি অপরাধীকে ছাড়াতে সুপারিশ করেন, তবে তাঁকেও ওই অপরাধী চক্রের অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চাঁদাবাজদের দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। র‍্যাবের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র—সারা দেশে প্রায় ৬৫০ জন চাঁদাবাজ ‘গডফাদার’ সক্রিয় রয়েছে, যাঁদের অধিকাংশেরই কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই দেশের ৬৪ জেলা থেকে প্রায় ৪ হাজার চাঁদাবাজের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে এবং সেই তালিকা ধরেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় একটি সমন্বিত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করা হয়েছে, যার লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে দেশকে চাঁদাবাজমুক্ত করা।

অভিযানের অংশ হিসেবে গত রবিবার রাতে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করে পুলিশ এক বলিষ্ঠ বার্তা দিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে শাসনগাছা বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। যদিও ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতাদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এর আগে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে যুবদল নেতার পরিচয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় র‍্যাব ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল।

রাজধানীর মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজির যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে, তা নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত পুরো এলাকায় দেড় শতাধিক চাঁদাবাজি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু এই অঞ্চলেই ফুটপাত, দোকান ও পরিবহন খাত থেকে মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয় বলে জানা গেছে। এই শক্তিশালী চক্রের ৭২ জন সদস্যের তালিকা এখন পুলিশের হাতে। মাঠপর্যায়ের এই অভিযানে নতুন নতুন রাঘববোয়ালদের নাম বেরিয়ে আসছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এই অভিযান কেবল সাময়িক কোনো প্রদর্শনী নয়, বরং একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের স্থায়ী পদক্ষেপে পরিণত হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।