বিশ্বের প্রাণী সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে এক বিরল ও অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল বার্লিন চিড়িয়াখানা। বন্দিদশায় থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গরিলা ‘ফাতু’ (Fatou) সম্প্রতি তাঁর জীবনের ৬৯তম বসন্ত পূর্ণ করেছে। গত সোমবার এই বয়োবৃদ্ধ ‘প্রাইমেট’-এর জন্মদিন উপলক্ষ্যে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এক বিশেষ ভোজের আয়োজন করে। চেরি টমেটো, বিট, লিকস এবং কচি লেটুস পাতার পসরা সাজিয়ে ফাতুকে তাঁর প্রিয় খাবারগুলো উপহার দেওয়া হয়। তবে নজরকাড়া এই আয়োজনে কোনো ঐতিহ্যবাহী ‘কেক’ রাখা হয়নি; কারণ ফাতুর মতো অতি বয়স্ক প্রাণীদের জন্য চিনিজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ফাতু মূলত ‘ওয়েস্টার্ন লোল্যান্ড’ (Western Lowland) প্রজাতির গরিলা। তাঁর জীবনকাহিনি কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের (Guinness World Records) তথ্য অনুযায়ী, ফাতুর জন্ম সম্ভবত পশ্চিম আফ্রিকার গহীন বনে। সেখান থেকে ১৯৫৯ সালে একজন ফরাসি নাবিক তাঁকে ফ্রান্সে নিয়ে আসেন। কথিত আছে, ফ্রান্সের মার্সেই শহরের একটি বারের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে গিয়ে ‘বিনিময় মূল্য’ হিসেবে ওই নাবিক ছোট্ট ফাতুকে দিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এক পশু ব্যবসায়ীর হাত ধরে ১৯৫৯ সালে তিনি তৎকালীন পশ্চিম বার্লিন চিড়িয়াখানায় আশ্রয় পান। সে সময় তাঁর বয়স প্রায় ২ বছর ছিল বলে ধারণা করা হয়। যদিও তাঁর সঠিক জন্মতারিখ অজানাই রয়ে গেছে, তবে ১৩ এপ্রিলকেই দাপ্তরিকভাবে ফাতুর জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়।
সাধারণত বন্য পরিবেশে গরিলাদের গড় আয়ু ৩৫ থেকে ৪০ বছর হয়ে থাকে। তবে যথাযথ তত্ত্বাবধান ও আধুনিক চিকিৎসা সেবার কল্যাণে চিড়িয়াখানা বা সংরক্ষিত পরিবেশে তারা দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে, যার এক জীবন্ত উদাহরণ হলো ফাতু। ২০২৪ সালে বার্লিন চিড়িয়াখানার আরেক প্রবীণ বাসিন্দা ‘ইঙ্গো’ (Ingo) নামের একটি ফ্লেমিঙ্গোর মৃত্যুর পর ফাতু এখন এই চিড়িয়াখানার সবচেয়ে প্রবীণতম সদস্য। উল্লেখ্য, ইঙ্গো পাখিটির বয়স প্রায় ৭৫ বছর হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
বর্তমানে ৬৯ বছর বয়সী ফাতু তাঁর বার্ধক্যজনিত কারণে কিছুটা নিভৃত জীবন যাপন করছেন। চিড়িয়াখানার অন্যান্য গরিলার সাথে খুব একটা মেলামেশা না করে তিনি নিজের আলাদা ঘরে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি তাঁর দাঁত হারিয়েছেন এবং বর্তমানে সামান্য গেঁটেবাত ও শ্রবণশক্তির সমস্যায় ভুগছেন। তবে এত সব শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ফাতুর মেজাজ ও স্বভাব এখনো অটুট।
বার্লিন চিড়িয়াখানার প্রাইমেট সুপারভাইজার ক্রিশ্চিয়ান অস্ট জানান, ফাতু চিড়িয়াখানার কর্মীদের সাথে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলেও মাঝে মাঝে বেশ জেদি ও একগুঁয়ে স্বভাবের হয়ে ওঠে। তবে ৬৯ বছর বয়সে এসে বিশ্বরেকর্ড গড়া এই সদস্যের এমন টুকটাক আবদার বা জেদকে বেশ আদরের সাথেই গ্রহণ করেন বার্লিন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ও দর্শনার্থীরা। ফাতুর এই দীর্ঘায়ু বিজ্ঞানীদের জন্য যেমন গবেষণার বিষয়, তেমনি প্রাণীপ্রেমীদের কাছে এক গভীর বিস্ময় ও আবেগের নাম।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।