৪০ হাজার মৃত্যু না কি আরও বেশি? ইরানে মার্কিন অস্ত্র পাচারের রহস্যময় তথ্য প্রকাশ্যে

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতে এবং ইসলামী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে চলমান জনরোষকে সশস্ত্র রূপ দিতে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহের চেষ্টা করেছিল- এমনই এক বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেছেন খোদ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন দেশটি বিক্ষোভে উত্তাল ছিল, তখন মার্কিন প্রশাসন কুর্দি মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের হাতে মরণাস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চাঞ্চল্যকর দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সরকারের পাঠানো সেইসব অস্ত্র শেষ পর্যন্ত সাধারণ বিক্ষোভকারীদের হাতে পৌঁছাতে পারেনি। ট্রাম্পের ধারণা, মধ্যস্থতাকারী কুর্দি বাহিনী সম্ভবত অস্ত্রগুলো নিজেদের দখলেই রেখে দিয়েছিল। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হলো যে, একদিকে যখন ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার নাটক করছিল, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে সিআইএ-র মাধ্যমে ইরান সরকারকে উৎখাতের নীল নকশা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল আমেরিকা।

উল্লেখ্য, দশকের পর দশক ধরে চলা পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটের মুখে পড়েছিল। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই গত বছরের শেষভাগে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। সেই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র এই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে বিক্ষোভকারীদের সশস্ত্র করার চেষ্টা চালায়। ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্টকে ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পাঠিয়েছি। কিন্তু কুর্দিরা হয়তো সেগুলো বিক্ষোভকারীদের না দিয়ে নিজেদের কাছেই রেখে দিয়েছে।”

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের সাথে ইতিপূর্বের বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মিল পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের কুর্দি বাহিনীকে ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে ইরান সরকার প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিল যে, বিদেশি শক্তির মদদে একদল ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘সন্ত্রাসী’ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করছে এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যা করছে।

বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইরান সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই সহিংসতায় তিন হাজারের কিছু বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। তবে ট্রাম্পের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ফক্স নিউজকে জানান, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার হতে পারে। যদিও আল জাজিরা ও মিডল ইস্ট আই-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই দাবির স্বপক্ষে কোনো নিরপেক্ষ প্রমাণ মেলেনি। অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) প্রায় ৬ হাজার ৮০০ মৃত্যুর তথ্য যাচাই করতে সক্ষম হয়েছে এবং জাতিসংঘের এক বিশেষ প্রতিনিধির মতে এই সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও ট্রাম্প কুর্দিদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ৫ মার্চ তিনি বলেছিলেন, ইরাকে অবস্থানরত কুর্দি বাহিনী যদি ইরান সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি হামলা চালাত, তবে সেটি বর্তমান প্রশাসনের জন্য ‘দারুণ’ হতো। তবে পরিস্থিতির জটিলতা আঁচ করে সম্প্রতি নিজের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করেছেন ট্রাম্প। তিনি এখন বলছেন, “কুর্দিদের সাথে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক থাকলেও আমরা চাই না এই যুদ্ধ আরও জটিল হোক। তাই কুর্দিদের সরাসরি ইরানে ঢোকার ধারণাটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।”

ট্রাম্পের এই অকপট স্বীকারোক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতিকে পুনরায় বিতর্কের মুখে ঠেলে দিল।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া