২২ এপ্রিলের ‘ডেডলাইন’ ও ট্রাম্পের নতুন রণকৌশল: উত্তাল পারস্য উপসাগরে ঘনীভূত হচ্ছে মহাসংকট

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে আবারও বড় ধরনের সামরিক রদবদলের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ইরান-মার্কিন উত্তজনা নিরসনে তেহরানকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে বাধ্য করতে এবার হাজারো অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানা গেছে, ইরানকে চরম কূটনৈতিক ও সামরিক চাপে রাখতেই ওয়াশিংটনের এই নতুন রণকৌশল। মূলত যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হলে সরাসরি স্থল অভিযান কিংবা নতুন করে বিধ্বংসী বিমান হামলা চালানোর পথ খোলা রাখতেই হোয়াইট হাউসের এই বিশেষ প্রস্তুতি।

পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, এই নতুন সেনাদলের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ ও এর পাহারায় থাকা যুদ্ধজাহাজগুলোর প্রায় ৬ হাজার চৌকস সদস্য। এ ছাড়াও এই বহরে যুক্ত হচ্ছে ‘বক্সার অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ’, মেরিন কোরের বিশেষ ‘টাস্কফোর্স’ এবং ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের আরও ৪ হাজার ২০০ সদস্য। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলতি মাসের শেষ দিকে এই বিশাল বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছালে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন অভিযানে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। নতুন এই ১০ হাজার ২০০ সেনা তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলে পারস্য উপসাগরের নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের জন্য আরও সহজ হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য, আগামী ২২ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ঠিক এই ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমার আগে মার্কিন সামরিক শক্তির এই প্রদর্শনী তেহরানের জন্য এক শক্তিশালী সতর্কবার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং অর্থনৈতিক অবরোধকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। গত রোববার তিনি ইরানের বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা সমস্ত নৌযানের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো তেহরানকে ‘হরমুজ প্রণালি’ খুলে দিতে বাধ্য করা, যা বিশ্ব তেলের বাজারের এক অবিচ্ছেদ্য রুট। একই সঙ্গে তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে আলোচনার টেবিলে চাপ অব্যাহত রাখা হয়েছে। যদিও গত সপ্তাহান্তের আলোচনা কোনো ফল ছাড়াই শেষ হয়েছে, তবে ট্রাম্প আশাবাদী যে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আবারও শুরু হতে যাওয়া বৈঠক থেকে কোনো সমাধান আসবে।

ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত ‘খুব দ্রুত’ শেষ হতে পারে। তিনি মূলত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে মরিয়া। ট্রাম্পের ভাষায়, “যখন এই সংকটের মীমাংসা হবে, তখন গ্যাসের দাম নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।”

বিপরীতে ইরানও নতি স্বীকার করতে নারাজ। মার্কিন অবরোধের জবাবে দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরান পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও লোহিত সাগর দিয়ে যাবতীয় আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেবে।” ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’ তাঁর এই মন্তব্য প্রকাশ করে জানিয়েছে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তেহরান যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস ফগো এই সামরিক সমাবেশকে ‘বাড়তি সক্ষমতা’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরি— ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং নতুন আসা ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ মোতায়েন থাকলে মার্কিন কমান্ডের হাতে যুদ্ধের সময় অনেক বেশি বিকল্প থাকবে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের কঠোর বিকল্প খোলা রেখেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।