২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক শেষেও মেলেনি সমাধান; তেহরান-ওয়াশিংটনকে কী কড়া বার্তা দিল পাকিস্তান?

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সংলাপ কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে। পরমাণু কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু নিয়ে চরম উত্তেজনার মধ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে নিয়ে আয়োজিত এই মধ্যস্থতা বৈঠকটি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান উভয় পক্ষকেই বর্তমান যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি কঠোরভাবে বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

রোববার (১২ এপ্রিল) পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক বিশেষ বিবৃতিতে দুই পরাশক্তিকে এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পরামর্শ দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের জন্যই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।" তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, পুরো অঞ্চলসহ বিশ্বজুড়ে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উভয় দেশ আলোচনার ইতিবাচক ধারা বজায় রাখবে। পাকিস্তান ভবিষ্যতেও দুই দেশের মধ্যে সংলাপ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সহজ করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এই হাই-ভোল্টেজ আলোচনার নেপথ্য কারিগরদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে ইসহাক দার জানান, গত ২৪ ঘণ্টা ধরে চলা কয়েক দফার অত্যন্ত নিবিড় ও গঠনমূলক আলোচনায় তিনি নিজে এবং পাকিস্তানের চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির সরাসরি মধ্যস্থতা করেছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের এই বিশেষ ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার জন্য তিনি ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষকেই ধন্যবাদ জানান।

তবে আলোচনার ফলাফল নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কণ্ঠে চরম হতাশা ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে ইসলামাবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত সরাসরি ভাষায় বলেন, "বড় দুঃসংবাদ হলো আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হইনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।"

অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই পরিস্থিতির একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি ছোট বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারলেও অন্তত ২ থেকে ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা 'ভাইটাল' ইস্যুতে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তিনি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "দীর্ঘ ৪০ দিনের একটি চাপিয়ে দেওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। চরম অবিশ্বাস ও সন্দেহের আবহে শুরু হওয়া এই সংলাপে মাত্র একটি বৈঠকেই সব সমাধান হয়ে যাবে—এমন আশা করা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত ছিল না। মূলত কেউই এমনটা আশা করেনি।"

উল্লেখ্য যে, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত দুই যুগ ধরে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর বিরোধ চলছে। এই সংকট নিরসনে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন সপ্তাহব্যাপী নিবিড় সংলাপ চললেও কোনো সমাধান আসেনি। এর ঠিক পরদিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে তাদের বিশেষ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। একই সময়ে ওয়াশিংটনের সাথে তাল মিলিয়ে ইসরায়েলও দেশটিতে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। দীর্ঘস্থায়ী এই অস্থিরতা প্রশমনে গত ৭ এপ্রিল উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল, যার ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হলো এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া