বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। গত মার্চের শুরু থেকে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হবে বলে মনে করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় ‘প্যারাডক্স’।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধবিরতিতে তেহরান মৌখিকভাবে রাজি হয়েছে, কিন্তু লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় তারা এই পথটি উন্মুক্ত করবে না। তেহরানের সাফ কথা—লেবাননে মিত্রদের ওপর রক্তপাত সচল রেখে কোনো যুদ্ধবিরতি পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটগুলো দেখাচ্ছে যে, পানামার পতাকাবাহী একটি বিশাল জাহাজ প্রণালির খুব কাছে পৌঁছেও পুনরায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। প্রচারিত বিভিন্ন ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, ‘হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এবং তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
বিপরীতে, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার খবরটি আদতে একটি ‘ভিত্তিহীন গুজব’। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত আপডেট পাচ্ছেন এবং তাঁদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, ইরান মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’-এর অংশ হিসেবে এই মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।
তবে বাণিজ্যিক জাহাজ বিষয়ক বিশ্বখ্যাত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এসএসওয়াই (SSY) এক ভয়াবহ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তারা জানায়, পারস্য ও ওমান উপসাগরে অবস্থানরত জাহাজগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) পক্ষ থেকে একটি কড়া বার্তা পেয়েছে। ওই বার্তায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বন্ধ আছে। এই পথ অতিক্রম করতে হলে আইআরজিসির সরাসরি অনুমতি লাগবে। অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশের চেষ্টা করলে সেই জাহাজটি তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই আইআরজিসি বৃহস্পতিবার একটি নতুন ও ‘বিকল্প রুট’ ঘোষণা করেছে। তাদের দাবি, মূল সমুদ্রপথে ছড়িয়ে থাকা শক্তিশালী ‘সি মাইন’ বা সামুদ্রিক মাইন এড়িয়ে জাহাজ চলাচলের সুবিধার্থেই এই নতুন রুটটি দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ইরানের এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক চাল, যার মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ‘ডেডলাইন’ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও, প্রণালিটি নিয়ে এই রশি টানাটানি বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা বজায় রেখেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যার ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির এই ‘লাইফলাইন’-এর ভবিষ্যৎ।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।